সময় ডেস্ক : মোংলা-খুলনা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের ৯ মরদেহের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ মাঠ চত্বরে জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে মরদেহগুলো দাফন করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহগুলো তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।
নিহত ১৪ জনের মধ্যে বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি, ভাগনে-ভাগনিসহ একই পরিবারের ৯ জন। শুক্রবার ভোরে তাঁদের মরদেহ পৌঁছায় মোংলার শেহালাবুনিয়ার আ. ছাত্তার লেন এলাকাস্থ নিহতের পরিবারের বাসভবনে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের (ছাব্বির)।
কনের বাড়িতে বিয়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরপক্ষ মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন ছিলেন মাইক্রোবাসে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বাগেরহাটের মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় বিপরীত দিক দিয়ে আসা নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নিহতরা হলেন- বর আহাদুর রহমান, তাঁর বাবা আবদুর রাজ্জাক, বরের ভাই আবদুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া (ঐশী), তাঁর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলমের (জনি) স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা (পুতুল), তাঁদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরও আছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম। নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
সকালে মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলাবুনিয়ার ছাত্তার লেনের বরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষের ভিড়। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর শুনে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। শোকে স্তব্ধ সবাই। আবদুর রাজ্জাকের বাড়ির ভেতরে রাখা হয়েছে পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ। পাশে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বাকি পাঁচজনের মরদেহ।
প্রতিবেশী নাসির খাঁন বলেন, ‘একসাথে একই পরিবারের এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না।’
নিহত গৃহকর্তা (বরের পিতা) আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার বলেন, ‘আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশপাশের ৯টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ করে একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।
নিহত উম্মে সুমাইয়ার শ্বশুর আবদুল আলীম বলেন, বর আহাদুরের মোংলা শহরে মোবাইল ফোনের দোকান ছিল। ‘রাজ্জাক ভাইয়ের (বরের বাবা) আদি বাড়ি কয়রায়। তাঁরা বৃহস্পতিবার ১২টার পর রওনা দেন। আমার পুত্রবধূ, একমাত্র নাতিও দুর্ঘটনায় মারা গেছে।’
স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আশরাফুল রহমান জনি। জনিও তার ছোট ভাই সাব্বিরের বিয়েতে খুলনার কয়রায় গিয়েছিলেন। বিয়ে শেষে পরিবারের সবাই মাইক্রোবাসে উঠলেও জনি ছিল মাইক্রোবাসের পেছন পেছন মোটরসাইকেলে। তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন জনি। গাড়ির পেছনে মোটরসাইকেলে থাকায় চোখের সামনেই দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছেন তিনি।
এত আপনজনকে একসঙ্গে হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন জনি। আর পরিবারের এত সদস্যদের মৃত্যুতে অসাড় হয়ে রয়েছেন মা আঞ্জুমানয়ারা। আর বেচে থাকা আরেক ভাই সাদ্দাম ক্ষণে ক্ষণে মুর্ছা যাচ্ছেন। জনি বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি একা হয়ে গেলাম।’ এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি তিনি।

No comments:
Post a Comment