৪ ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি না জায়েজ - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Friday, 8 July 2022

৪ ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি না জায়েজ


সময় ডেস্ক :
কোরবানির আভিধানিক অর্থ হলো কাছে যাওয়া বা নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামি পরিভাষায় কোরবানি মানে হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরিয়তের বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা।


স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম যদি কোরবানি ঈদের তিন দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত এর মধ্যে সাহেবে নিসাব যার মানে হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্যের মালিক থাকেন বা হন, তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব হবে। সাহেবে নিসাব তথা সামর্থ্যবান ব্যক্তির হাতে নগদ অর্থ না থাকলে আপাতত ধার করে হলেও ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে হবে। একটি কোরবানি মানে হলো একটি ছাগল, একটি ভেড়া বা একটি দুম্বা অথবা গরু, মহিষ ও উটের সাত ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ একটি গরু, মহিষ বা উট সাতজন শরিক হয়ে বা সাত নামে অর্থাৎ সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে।


মূলত গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানি করতে হয়। যেমন ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, গরু, মহিষ ও উট। এই ছয় প্রকার পশু দ্বারা কোরবানি করা যায়, এ ছাড়া অন্য কোনো পশু দ্বারা কোরবানি করা যায় না। এ ধরনের পশুকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহিমাতুল আনআম অর্থাৎ অহিংস্র গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু।’


এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছি। জীবনোপকরণ স্বরূপ তাদের যেসব ‘বাহিমাতুল আনআম’ দিয়েছি, সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ। সুতরাং তোমরা তারই আনুগত্য করবে। আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে (সূরা হজ, আয়াত ৩৪)।


কোরবানির পশু কেমন হবে এ সম্পর্কে হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা চেষ্টা করবে কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট বয়সের পশু নির্বাচন করতে। যদি না পাও তাহলে ছয় মাসের দুম্বা কোরবানি করতে পারো (মুসলিম)।


কোরবানির জন্য ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স এক বছর হতে হয়। গরু ও মহিষের বয়স দুই বছর এবং উটের বয়স পাঁচ বছর হতে হবে। দুম্বার এক বছর পূর্ণ না হলেও যদি এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট হয় তাহলে চলবে। উল্লিখিত পশুগুলো নর বা মাদি যা-ই হোক না, তা দ্বারা কোরবানি করতে কোনো বাধা নেই। কোরবানির পশু তরতাজা ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। কোনো খুঁত থাকলে সে পশু দ্বারা কোরবানি আদায় হবে না।


কোরবানির পশু হতে হবে দোষ ত্রুটিমুক্ত। 


পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি দেয়া যাবে না সেগুলো হলো:


১. দৃষ্টিশক্তি না থাকা


২. শ্রবণশক্তি না থাকা


৩. অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণ-শীর্ণ হওয়া


৪. এই পরিমাণ লেংড়া যে জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম


৫. লেজের বেশির ভাগ অংশ কাটা


৬. জন্মগতভাবে কান না থাকা


৭. কানের বেশির ভাগ কাটা


৮. গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া


৯. পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া


১০. বেশির ভাগ দাঁত না থাকা


১১. রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া


১২. ছাগলের দুটি দুধের যেকোনো একটি কাটা


১৩. গরু বা মহিষের চারটি দুধের যেকোনো দুটি কাটা।


কোরবানির পশু বড় ধরনের দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে। হাদিসে এসেছে, চার ধরনের পশু, দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। সেগুলো হলো অন্ধ, রোগাক্রান্ত, পঙ্গু ও যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৪৪)।


যেসব ত্রুটি থাকলেও পশু কোরবানি দেয়া যাবে সেগুলো হচ্ছে :

১. পশুটি পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমতো খায়


২. লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে বেশির ভাগ অংশ আছে


৩. জন্মগতভাবে শিং নেই


৪. শিং আছে, তবে ভাঙা


৫. কান আছে, তবে ছোট


৬. পশুর একটি পা ভাঙা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে


৭. পশুর গায়ে চর্মরোগ


৮. কিছু দাঁত নেই, তবে বেশির ভাগ আছে।


৯. পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম


১০. পুরুষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম।


তবে সর্ব উত্তম হচ্ছে ত্রুটিমুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি দেয়া, ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কোরবানি দেয়া অনুচিত।


কোরবানির পশু যেকোনো মুসলমান জবাই করতে পারেন। নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবাই করা উত্তম। সেক্ষেত্রে দোয়া জানা জরুরি নয়। নিজে জবাই করতে না পারলে যেকোনো কাউকে দিয়ে জবাই করাতে পারবেন। জবাইয়ের সময় নিজে উপস্থিত থাকতে পারলে ভালো। একটি কোরবানি মানে হলো একটি ভেড়া, ছাগল বা দুম্বা কোরবানি করা। গরু, মহিষ ও উটে অনূর্ধ্ব সাতটি পর্যন্ত অংশ বা ভাগ দেয়া যাবে। আর আকিকা হলো একটি বা দুটি ছাগল কোরবানি করা। সুতরাং গরু, মহিষ বা উটের অংশ হয়ে যেভাবে কোরবানি দেয়া যায়; সেভাবে একটিকে সাতটি ভাগ ধরে সে অংশ হিসেবেও আকিকা দেয়া যায়। কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে করতে কোনো বাধা নেই। ওয়াজিব ও নফল কোরবানির গোশত খাওয়া যায় এবং খাওয়ানো যায়; এটি সবাই খেতে পারেন। তবে উত্তম হলো তিন ভাগের এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে দেয়া, এক ভাগ গরিব পাড়া-প্রতিবেশীদের দেয়া এবং এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য রাখা।


ওয়াজিব কোরবানি ছাড়া ছোট, বড়, জীবিত, মৃত যে কারও পক্ষ থেকে যে কেউ নফল কোরবানি আদায় করতে পারেন। এতে উভয়েই সওয়াবের অধিকারী হবেন। নারী যদি সামর্থ্যবান বা সাহেবে নিসাব হন, তার জন্যও কোরবানি ওয়াজিব। শিশুদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়ারা যেহেতু নারী ও পুরুষ উভয় কাতারেই পরে তাই তারাও প্রাপ্তবয়স্ক এবং সামর্থ্যবান হলে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো কোরবানিও ওয়াজিব হবে।


অনেকে মনে করেন, কোরবানির পশুর শিং বাড়ি বা ঘরের সামনে ঝুলিয়ে রাখলে বাড়িঘর নিরাপদ থাকে। জিন-ভূত ও চোর-ডাকাত আসতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কোরআন, হাদিস ও বিজ্ঞানে এর কোনো ব্যাখা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কোরবানির পশুর রক্ত পায়ে লাগালে পায়ের তলার ক্ষত বা ফাঙ্গাস সেরে যায় এ সব ধারণাও ভুল। এ সব বিষয় কোরআন বা হাদিস সমর্থিত নয়। মূলত সামর্থ্যবানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব; গোশত খাওয়া ওয়াজিব নয়। শারীরিক বা অন্য কোনো অসুবিধা না থাকলে কোরবানির গোশত খাওয়া ও খাওয়ানো সুন্নত।


সঠিকভাবে কোরবানির জন্য বেশি দাম দিয়ে পশু কেনায় কোনো মাহাত্ব নেই। এ কাজ যারা করেন, তারা কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে না পেরেই তা করে থাকেন। ‘আল্লাহকে ভালোবেসে তার রাস্তায় ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে আমি কোরবানি করছি’এমন উপলব্ধি হৃদয়ে স্থান না পেলে সে কোরবানি শুধু পশু জবাই করে মাংস খাওয়ার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, কোরবানির পশুর মাংস, রক্ত কিছুই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না; পৌঁছে একমাত্র তাকওয়া। আর এ তাকওয়ার উপস্থিতি না থাকলে পশু কোরবানির কোনো সার্থকতা নেই।



No comments:

Post a Comment

Pages