বিশেষ সংবাদদাতা : ‘কার হুগদা খাওগো বান্দি, ঠাকুর চিনো না’ সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর একটি বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে কথাটি বলেছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) আসাদ উদ্দিন নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাসে এ কথা বলেন।
সম্প্রতি সিসিক মেয়র, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর একটি বক্তব্য নিয়ে সিলেটে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরিফ বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের সামনে বক্তৃতাকালে বলেন, ‘এই (সিলেট) অঞ্চলে সাইফুর রহমানের যে স্মৃতিগুলো থেকে সাইফুর রহমানের নাম মুছে ফেলে দেয়া হয়েছে; তেমনি আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার নামও মুছে ফেলা হয়েছে। আমাদের নেতা শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম মুছে ফেলছে। কিন্তু মুছে ফেললেও মানুষের মুখ থেকে নতুন নাম কিন্তু উচ্চারণ করাতে পারছে না। মানুষ এখনো জানে সেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আজকে যেটা গর্ব করে বলেন- বিভাগীয় স্টেডিয়াম, যা-ই বলেন না কেন এই অঞ্চলে বলতে গেলে অনেক বলতে হবে। আমি শুধু বলবো, এদের সম্পর্কে কিছু বলে লাভ নেই। এদেরকে ধিক্কার দেয়া ছাঁড়া কোনো বক্তব্য আমার মুখেও আসতেছে না। এদের চামড়া এতো শক্ত হয়েছে; যে গণ্ডারের চামড়া থেকে আরও বেশি। এদের গায়েও কিছু লাগে না।’
বক্তৃতাকালে আরিফ আরো বলেন, আর ঘুম থেকে উঠে তারা বিএনপি’র পরিবারের ওপর শহীদ জিয়া থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান পর্যন্ত শেষ হয়। তসবির মতো জপতে থাকে। তাদের আর কোনো কাজ নেই। তারা সরকারে বসে ঘুম থেকে উঠে কি বলবো, ভাষায় বলার মতো নেই। এখন তারা শেষ পর্যন্ত সব ধ্বংস করে দিয়ে এখন লাগছে পদকটা নিয়ে টানাটানি। এদের যে কী দশা হবে আল্লাহ জানে। আসলে তারা ভীত।’
আগামী আন্দোলন সংগ্রামে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী সেদিন আরো বলেন, ‘আমি একটি কথা বলে রাখি- আমাদের নেতৃবৃন্দরা; আমাদের মনে বল থাকতে হবে। জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বলবো- আর বেশি সময় দেয়া এদেরকে উচিত নয়। এরা আসলে শিয়ালের মতো পালাবার চেষ্টা করতেছে। বিশ্বাস করেন- মামলা মোকাদ্দমা নিয়েও আমাদের মনের মধ্যে শান্তি আছি, দেশের মধ্যে আছি। তারা প্রত্যেকের বউ বাচ্চা কীভাবে পাঠিয়ে দেবে, মোটামুটি ৭০ ভাগ পাঠিয়ে দিয়েছে। আর যারা রয়েছে তারা অস্থিরতার মধ্যে আছে। কাজেই একটি শক্ত আন্দোলন দরকার। এমন সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার; আমাদের জেলা ওয়ারী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তোমার এলাকা তুমি নিয়ন্ত্রণ করবে। এভাবে আন্দোলন করতে হবে। আর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের নেত্রীকে মুক্ত করতে হবে, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। এবং তখনই মরহুম এম সাইফুর রহমানের আত্মায় শান্তি পাবে।’
এদিকে- আরিফুল হক চৌধুরীর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তোলপাড়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা আলোচনা করছেন।
সিলেট আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ শুক্রবার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সেই ‘কটূক্তিমূলক’ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এসব অসৌজন্যমূলক, অশালীন বক্তব্য প্রত্যাহার করার আহবান জানাচ্ছি। মেয়র সাহেব, আপনি ভুলে যাবেন না আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়রের চেয়ারে বসে আছেন এবং ইচ্ছামতো সরকারের টাকার অপচয় করছেন।
অতীতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন মহোদয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সিলেট নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দু-হাত ভরে সিটি করপোরেশনকে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছেন। আপনি সেই টাকায় পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে যা ইচ্ছা তা করে যাচ্ছেন। এত গাফিলতি এবং অনিয়মের পরেও সরকার উন্নয়নের স্বার্থে দেশের একসময়ের শীর্ষ তালিকাভূক্ত দুর্নীতিবাজ হওয়া সত্ত্বেও আপনার বরাদ্দ বন্ধ করেনি, কিংবা সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেনি। কারণ আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না বরং সম্প্রীতির রাজনীতিতে বিশ্বাসী। দুঃখ হয়, এত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও আপনি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গন্ডারের চামড়ার সাথে তুলনা করলেন। আর কি পেলে আপনার মধ্যে সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নেবে?
আসাদ উদ্দিন স্ট্যাটাসে আরো বলেন, বক্তব্যে আপনি শক্ত আন্দোলনে যাওয়ার কথা বললেন। সেটি আবার মিছিল-মিটিং ছাঁড়া অন্যভাবে। তবে কি আপনি আবারও ২০১৪ সালের মতো পেট্রোল বোমার দ্বারা পুড়িয়ে মানুষ হত্যার ইঙ্গিত দিলেন? ভবিষ্যতে যদি আধ্যাত্মিক নগরী সিলেটে এধরণের কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটে তবে উস্কানিদাতা হিসেবে এর দায়-দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় পর থেকেই আপনি নগর ভবনকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনকে রূপ দিয়েছেন মানুষের আতঙ্কের প্রতিষ্ঠান হিসেবে। অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে মাস্টার রোলে নিয়োগ দিয়েছেন কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। যানবাহন ক্রয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ে করা হয়েছে পাহাড়সম দুর্নীতি। এক কাজ একাধিকবার করে তুলেছেন শত কোটি টাকা বিল। জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন পর্যন্ত শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও মাত্র ১০ মিনিট বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায় অর্ধেক নগরী। নগরবাসীর আবেগের যায়গা হযরত মানিক পীর গোরস্থানে মানুষের স্বজনের কবরে চালিয়েছেন বুলডোজার, জুতা পায়ে সদলবলে হাঁটছেন কবরের উপর দিয়ে।
নগরবাসীকে পানীয় জলের ব্যবস্থা আর মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে চরম ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছেন। আর, সিলেটের রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কথাতো মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু তা আপনার কানে পৌঁছায় না।
গত কয়েকদিন আগেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সিটি করপোরেশনের বরাদ্দ থেকে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন ইউনিয়নের জায়গায়। জনশ্রুতি আছে, শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে নিজের মালিকানাধীন ভূমির কদর বাড়াতেই এ কাজ করা হয়েছে। আপনার এসব আচরণ দেখে সিলেটি ভাষার একটা প্রবাদ খুব মনে হচ্ছে- কার হগদায় খাওগো বান্দি, ঠাকুর চিনোনা।’

No comments:
Post a Comment