সিলেটে বয়োবৃদ্ধ মায়ের ঠাঁই হলো না ছেলের ৫টি বিল্ডিং এর কোথাও - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Friday, 10 September 2021

সিলেটে বয়োবৃদ্ধ মায়ের ঠাঁই হলো না ছেলের ৫টি বিল্ডিং এর কোথাও


নিজস্ব সংবাদদাতা :
বয়সের ভারে ন্যুব্জ শুকুরা বেগমে (৭৫)। তিনি কানাইঘাট উপজেলার চাপনগর এলাকার মৃত জোয়াহীদ আলীর স্ত্রী। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে। 


একমাত্র ছেলে সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী বিদেশে আতর ব্যবসা করে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। পেয়েছেন বিপুল পৈতৃক সম্পত্তি। বিদেশের ব্যবসা গুটিয়ে অবস্থান করছেন দেশে। বর্তমানে শহরে ও গ্রামে রয়েছে ৫টি বিশাল অট্রালিকা। সেগুলোর ভাড়া তোলাসহ দেখভাল করলেও জন্মদাতা মায়ের প্রতি নেই কোন দায়দায়িত্ব।


অভিযোগ রয়েছে, বার্ধক্যজনিত কারনে নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত বৃদ্ধার ছেলের বউ তার যত্ন নেয়া তো দূরের কথা ছেলের প্রশ্রয়ে শাশুড়িকে বকাঝকা করে আসছে। টানা একবছর যাবৎ বৃদ্ধাকে শহরের একটি বাসায় বন্দি করে রাখার অভিযোগও রয়েছে। পাষণ্ড ছেলের বউ শেষ বয়ষে শাশুড়িকে বাসার বাহিরে বের করে দিয়ে বলে- যেদিকে ইচ্ছা যাও।

 

বৃদ্ধা শুকুরা বেগমের মেয়ের ঘরের নাতনী সানজিদা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, আমার নানীকে নগরীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকার ৭৮ নম্বর বাসায় তাঁর ছেলে সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী বন্দী করে রাখেন। এক বছর বন্দী থাকতে থাকতে সুযোগ পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় পাশের ঘরে যাওয়ার অপরাধে রাত ১০ টার দিকে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিলেন ছেলের স্ত্রী। 


গত ৬ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিলে তিনি জীবনের শেষ বয়সে আশ্রয় নেয়ার জন্য নগরীর পথে পথে হেঁটে হেঁটে ভিক্ষা করে টাকা সংগ্রহ করে রাত কাটিয়ে পরদিন মঙ্গলবার সকালে কানাইঘাট উপজেলায় নিজের বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পান এবং বাম পা ভেঙ্গে যায়। সেখান থেকে খবর পেয়ে নানীর ভাইয়ের ছেলে তাজুল ইসলাম তাকে স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ভর্তি করেন। এর পর থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন। কিন্তু ঘটনার খবর পেয়েও আমার মামা কিংবা তাঁর পরিবারের কেউ নানীর কাছে আসেননি। তাই আমি কানাইঘাট থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি।

 

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় তিন তলার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শুকুরা বেগমের তত্ত্বাবধান করছেন সিলেট জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ওসমানী হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা সদস্য মো. জনি। পরের ছেলে হলেও দেখভাল করছেন নিজের মায়ের মতই।


গুরুতর আহত শুকুরা বেগম ঠিকমত কথা বলতে পারছেন না। পুলিশ সদস্য জনি জানান, গত বুধবার (০৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর শুকুরা বেগমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কানাইঘাট থানার ওসির নির্দেশে তিনি বৃদ্ধা নারীর সকলরকম তত্ত্বাবধান করছেন।


তবে বৃদ্ধা এটুকু বলতে পারছেন, ‘ছেলের বউ বের করে দিয়েছে। বলেছে, যেদিকে ইচ্ছা যাও। তাই আমি মুনাফিকদের ঘরে আর যাবো না। তারা এক ঘরে বন্দী করে রাখে। তাদের কাছে গেলেই ধমক দেয়।’

 

ছেলে কি করেন জানতে চাইলে বলেন, আগে বিদেশে আতরের ব্যবসা করত। এখন দেশে ৪ টা বিল্ডিং আছে (বাসা)। অনেক টাকা মাসে ভাড়া পায়।


এদিকে শুকুরা বেগমের মেয়ের ঘরের নাতনী সানজিদা সুলতানা সাংবাদিকদের আরও বলেন, আমার নানা মারা যাওয়ার পর নানী বাড়িতে থাকতেন। নানার অনেক সম্পদ। আর তাঁদের সন্তান বলতে আমার মা আর মামা সিরাজ উদ্দিন চৌধুরী। এর মাঝে আমার মা মারা গেছেন। বেঁচে আছেন মামা। মামার সিলেট শহরে ২টি বাসা, কানাইঘাটে গ্রামের বাড়িসহ তিনটি বাড়ি আছে। সব মিলে মোট ৫টি বাসা তাঁর। কিন্তু মামা নানীর কোনো দায়দায়িত্ব নিচ্ছেন না। তারা গত এক বছর থেকে নানীকে গ্রাম থেকে শহরে এনে এক ঘরে বন্দী করে রাখেন। গ্রামের ঘরটি তালা দিয়ে রেখেছেন।

 

অপরদিকে অভিযুক্ত ছেলে সিরাজ উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাঁর স্ত্রী রেনু বেগমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যার মা দায় তাঁর। এখানে কেউ মামলা করে আর কিছুই করে কোন লাভ হবে না। আমরাতো দেখতে গিয়েছি। টাকাও দিয়েছি। সকল দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি। এখানে অন্য কারো মাথা ব্যথা কেন?’


এদিকে কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাজুল ইসলাম বলেন, গত বুধবার ওই বৃদ্ধার মেয়ের ঘরের একজন নাতনী অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। তাৎক্ষনিক আমি বৃদ্ধার ছেলের সাথে কথা বলেছি। ব্যাপারটি খুবই দুঃখজনক। পরে আমি হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা জেলা পুলিশের সদস্য জনিকে বলেছি, যেন সে দেখাশোনা করে। অবশ্য আমার ফোন পাওয়ার পর ছেলে একবার গিয়ে দেখে এসেছে শুনেছি। তবে ওই বৃদ্ধার ছেলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান ওসি।



No comments:

Post a Comment

Pages