ছাতক-খাজাঞ্জীবাসীর স্বপ্নভঙ্গ, চালু হচ্ছে না ট্রেন - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Wednesday, 19 August 2026

ছাতক-খাজাঞ্জীবাসীর স্বপ্নভঙ্গ, চালু হচ্ছে না ট্রেন


জাবেদ এমরান : :
আগস্টের শেষে কিংবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে সিলেট-ছাতক রেলপথে পুনরায় ট্রেন চালু হওয়ার কথা ছিল। সংস্কার কাজের ধীরগতির কারনে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় এর-ই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি মাসের ২৩ আগস্ট শেষ হবে। চাহিদা অনুযায়ী মেয়াদ বৃদ্ধি হলে ছাতক, খাজাঞ্চিগাঁওবাসী ট্রেনে চড়ার স্বপ্ন আবারো বুনবে। শতশত কৃষক তাদের উৎপাদিত শাকসবজি নিয়ে শহরমুখী হবেন। চাহিদার যোগানে যেমন পণ্যের চাপ কমবে তেমনি ঊর্ধ্বগতির বাজারে দ্রব্যমূল্য হ্রাস পাবে।


ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, পেপার মিল ও পাথর কোয়ারির ভারী মালপত্র এবং যাত্রী পরিবহনের উদ্দেশ্যে ১৯৫৪ সালে মিটার গেজ লাইন দিয়ে সিলেট-ছাতক রেলপথ চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ছাতকের বাঙলাবাজার, খাজাঞ্চিগাঁওসহ তৎসংলগ্ন অঞ্চলের উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্য নিয়ে সকালে ট্রেনে চড়ে কৃষকরা শহরে বিক্রি করে বিকেলে বাড়ি ফিরতেন। শহরবাসী ন্যায্যমূল্যে তরতাজা এসব শাকসবজি, কৃষিপণ্য ও গৃহস্থালি নানা জিনিষপত্র স্বাচ্ছন্দ্যে ক্রয় করতেন।


২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনের মধ্যে ১২ কিলোমিটার রেলরোড এমব্যাংকমেন্ট ও রেলপথ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর জরাজীর্ণ রেলপথ ব্যবহারে অনুপযোগী হওয়ায় দীর্ঘদিন রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। 


২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় সিলেট-ছাতকবাজার সেকশনের ক্ষতিগ্রস্ত মিটার গেজ ট্র্যাক সংস্কারের অনুমোদন করা হয়। তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট টু ছাতক রেলপথের সংস্কার ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়।



প্রকল্প কাজে ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করা হলে চারটি দরপত্র জমা পড়ে। দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে টিইসি কর্তৃক সুপারিশ করা রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মীর আখতার হোসেন লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। প্রকল্পটি শেষ করতে ১৮ মাস বা দেড় বছর সময় বেধে দেয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ এর-ই মধ্যে শেষ হবে চলতি বছরের ২৩ আগস্ট, অর্থাৎ আরো কয়েকদিন পর। বৃষ্টি মৌসুম শুরু হওয়ায় চার মাস ধরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা যুক্তি তোলে ধরেন।


গত ৯ মে বর্তমান বিএনপি সরকারের সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ (হাবিব) এমপি সিলেটে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শনের জন্য ট্রেনযোগে সিলেট সফর করেন। সেদিন তিনি সিলেট রেলস্টেশন সংলগ্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড এর সিলেট অফিসে প্রকল্প সংশ্লিষ্টের সাথে এক সংক্ষিপ্ত সভায় বসেন। সে সময় তিনি সিলেট-ছাতক রেললাইনের সংস্কার কাজের খোঁজখবর নেন। সিলেট অঞ্চলের জনসাধারণের জনদুর্ভোগ লাগবে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া প্রজেক্ট বাতিল না করে বিএনপি সরকার দ্রুত রেললাইনের কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে বলে জানান। সেদিন এই প্রতিবেদকের সামনে প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সময়ে প্রকল্প কাজ শেষ করতে তাগাদা দিয়ে যান।


ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, সিলেট থেকে ছাতক এর দূরত্ব ৩৩ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই রেলপথে কালভার্ড রয়েছে দশটি। ইতিমধ্যে চারটি কালভার্ডের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। পঞ্চম কালভার্ডের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর্যায় রয়েছে। আর পাঁচটি কালভার্ডের আংশিক কাজ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।


সিলেট-ছাতক এর মধ্যে রেলস্টেশন রয়েছে মোট তিনটি। খাজাঞ্চিগাঁও, ছাতক ও আফজালাবাদ স্টেশন আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি- তিন স্টেশনের ২০ ভাগ কাজ এর-ই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৬০জন লোকবল নিয়ে কাজ করছে।



১৮ মাসের প্রকল্পের মধ্যে ১৪ মাসে তিনটি রেলস্টেশন, পাঁচটি কালভার্ডসহ ৩৩ কিলোমিটার রেললাইনের এই প্রকল্পে মোট ২০ ভাগ কাজ হয়েছে। তার মধ্যে ১৩ কিলোমিটার মাটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলমান আছে সাড়ে ১০ কিলোমিটার মাটির কাজ। আর সাড়ে ৯ কিলোমিটার রেললাইনে মাটি ভরাটের কাজে এখনো হাত দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।


নতুন স্লিপার স্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত রেলট্র্যাক ও ব্যালাস্ট পুনর্নির্মাণ এবং স্টেশনগুলোর আধুনিকায়নের কাজ সর্বসাকুল্যে  হয়েছে মাত্র ২০ ভাগ। ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে শিগগিরই রেললাইন ও অন্যান্য সংযোগকারী যন্ত্রাংশ চায়না থেকে কেনার কথা। সাবব্যালাস্ট, ব্যালাস্ট, ট্র্যাক স্থাপনের কাজ তিন মাসে শেষ করা সম্ভব বলে নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জোড় দাবি জানায়। 


ছাতক উপজেলার ৪নং কালারুকা ইউনিয়নের বাসিন্দা ইয়ার আলী জানান, সিলেট-ছাতক রোডে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় আমরা যাত্রীরা মারাত্মত দুর্ভোগে আছি। যেখানে আগে মাত্র ১২ টাকার টিকেট কেটে ছাতক থেকে সিলেট ট্রেনে যাতায়াত করতে পেরেছি, সেখানে এখন ৮০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া গুনতে হয়। আর সময়ও দিগুণের বেশি লাগছে। খানাখন্দে ভরা সড়কে প্রায় দিন ঘটছে দুর্ঘটনা। বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মুমূর্ষু রোগী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের। ছাতক, গোবিনগঞ্জ ও খাজাঞ্চিগাঁও এর মানুষের দাবি রেললাইনের কাজ দ্রুত শেষ করে সিলেট-ছাতক ট্রেন পুনরায় চালু করার।


আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রকল্পের মেয়াদ আরো দশ মাস বাড়ানোর জন্য আমরা কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করেছি। বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত দশ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু হবে বলে এই কর্মকর্তা আশ্বস্ত করেন। 


তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে এই কাজের জন্য ৫ কোটি টাকার মালামাল চট্রগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে এবং কয়েকদিনের মধ্যে সিলেটে এসে পৌছাবে। তিনি এসব কথা মুখে বললেও মালামাল কেনার কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারেনি। 


বিষয়টি নিয়ে আরো জানতে সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কার ও পুনর্বাসন প্রকল্প পরামর্শক টিম লিডার (ace-ddc jb) মো. আনার মাহমুদ এর দ্বারস্থ হলে তিনি জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্তিক সংকটের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিতে কাজ হয়। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ শেষ করতে বারবার তাগিদ দিয়েছেন বলে জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই প্রকল্প বাতিল হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

No comments:

Post a Comment

Pages