সময় ডেস্ক : নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীর প্রবেশমুখে প্রশাসনের দেওয়া বাঁশের আড় উপড়ে ফেলে বালু-পাথর আনা-নেয়া করছেন বালুখেকোরা। বালুমহালে বৈধভাবে উত্তোলন বন্ধ থাকলেও অবৈধভাবে দিনে কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ বারকী নৌকা-বাল্কহেড বালু-পাথর উত্তোলন করে বহাল তবিয়তে বের হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চলছে শত শত বোমা মেশিন। সুনামগঞ্জের বড় বালু-পাথর মহাল ধোপাজানে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, বিআইডব্লিউটিএ, সুনামগঞ্জ পৌরসভা, গৌরারং ও সুরমা ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন নামে টোল আদায়ের নামে চলছে চাঁদাবাজি।
বালু-পাথর ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, দিনে ছোট বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০০ নৌকা বের হয় মহাল থেকে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নামে আদায় হয় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। মাসে ২০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে এখানে।
সুনামগঞ্জের বড় পাথর মিশ্রিত বালু মহাল ধোপাজান। গেল প্রায় ছয় বছর হয় এই মহালটি ইজারাবিহীন। বড় এই মহালটি একেক সময় একেকপন্থায় লুটপাট হয়। কোনো সময় জব্ধ বালু-পাথর নিলাম নিয়ে এই বালু পাথর বহনের বৈধতা দেখিয়ে লাখ লাখ ঘনফুট বালু-পাথর উত্তোলন করা হয়। কখনো ড্রেজার মেশিন দিয়ে, কিংবা হাতের যন্ত্র দিয়ে শত শত নৌকায় বালু-পাথর উত্তোলন করে এই লুটপাট চলে।
সম্প্রতি ওখানে বালু লুটপাট এবং চাঁদাবাজি বেড়েছে। ডলুরা জিরো পয়েন্ট থেকে ডলুরা মসজিদের ঘাট পর্যন্ত এলাকায় দিনে-রাতে চলছে বালু লুটপাট। নদীর কাইয়ারগাঁও এলাকায় রাতে ড্রেজার মেশিনে নদীর বুক খনন চলছে। তাতে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। এসব ড্রেজার মেশিন এবং বালু উত্তোলনকারীদের কাছ থেকে উত্তোলনের সময় থেকে সুরমা নদীর আব্দুজ জহুর সেতু এলাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচ স্থানে চাঁদাবাজি হয়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, বিআইডব্লিউটিএ, সুনামগঞ্জ পৌরসভা ও দুইটি ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচটি টাকা আদায়ের রশিদ দিয়ে সুনামগঞ্জ বালু পাথর ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশে নদীতে উত্তোলন বন্ধ। অথচ এসব রশিদ দিয়ে চাঁদা আদায় করে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বালু-পাথরের বৈধতা দেওয়া হয়।
সরেজমিনে ধোপাজান-চলতি নদীতে গিয়ে দেখা যায়, চলতি নদীর মুখে কিছু বাঁশ ভাসছে। ওখান দুইদিন আগে বাঁশের বেড়া নির্মাণ করে সাইনবোর্ড সাঁটিয়েছিল প্রশাসন। এগুলো উপড়ে ফেলেছে বালু বহনকারী বাল্কহেড ও বারকী নৌকার চালক-শ্রমিকরা।
আরো দেখা গেছে, এই মুখ দিয়েই কয়েকশ বড়-মাঝারি-ছোট নৌকা ঢুকছে। শ্যালো ইঞ্জিনচালিত এসব নৌকার শব্দে সতর্ক অবস্থানে নদীর পাড়ে থাকা একদল মানুষ। নদীর পাড় থেকে কয়েকটি হ্যান্ড মাইক দিয়ে বিশেষ সংকেত দেওয়া হচ্ছিলো। পরে জানা গেল, বালুভর্তি নৌকা থেকে টাকা আদায় করতে মাইকে এই হাঁকডাক।
ডলুরা এলাকায় আরো ভয়ঙ্ককর চিত্র দেখা গেছে। ভাঙনের শিকার নদীর পাড়ে বড় বড় বাল্কহেডে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। ৩০ থেকে ৪০ টি বাল্কহেডকে এই প্রক্রিয়ায় বালু তুলতে দেখা গেছে। নদীর একদম শেষ সীমান্তে (ভারতের সীমানার কাছাকাছি) হাজারো বারকী শ্রমিককে বালু তুলতে দেখা গেছে। এদের কেউ কেউ ড্রেজার মেশিন আবার কেউ পুরাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করছেন। দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে এসব নৌকা ভরাট হয়ে আবারো ফেরার পথ সুরমামুখী হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টায় শতাধিক নৌকা বালুভর্তি করে বের হয়ে আসছে।
স্থানীয় বারকী শ্রমিক সংঘের সভাপতি নাছির উদ্দিন বলেন, নদীতে সব আইন-কানুন বারকী শ্রমিকদের জন্য। ড্রেজার মেশিন দিয়ে যারা বালু ওঠাচ্ছে, তাদের জন্য আইন শিথিল। আমরা বৈধভাবে বালু উত্তোলন করে জীবিকা রক্ষার লড়াইয়ে নামবো।
শ্রমিক নেতা সাইফুল আলম ছদরুল বলেন, মহালে অপরাধীদের একটি সংগঠিত দল লুটপাটে নেমেছে। এ জন্য বারকী শ্রমিকরা টিকতে পারছে না।
বালু-পাথর ব্যবসায়ী সমিতির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বললেন, নদীতে প্রতিদিন ছোট বড় মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ নৌকায় বালু বহন করছে। উপজেলা পরিষদের টোল ট্যাক্সের কথা বলে মনিপুরহাটি এলাকায় নৌকা প্রতি এক হাজার থেকে আট হাজার টাকা, বিআইডব্লিউটিএ’র রশিদ দিয়ে একই পরিমাণের টাকা এবং পৌরসভার টোল ট্যাক্সের রশিদ দিয়েও ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদ ও সুরামা ইউনিয়ন পরিষদের নামে রশিদ কেটে টাকা তোলা হয়।
বালু-পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নজির আহমদ বললেন, আমরা যারা ব্যবসায়ী তারা ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। যেহেতু নদী থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ, আমরা চুরি করে ব্যবসা করতে চাই না। ব্যবসায়ীরা না থাকলেও এখন শত শত মানুষ ড্রেজার মেশিন দিয়ে এবং বারকী নৌকা দিয়ে বালু উত্তোলন করে বিক্রয় করছে। প্রশাসনসহ সবাই দেখছেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেই।
স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীরা জানান, অবৈধভাবে উত্তোলন ও বিক্রয় করা এসব বালু-পাথরের টাকার ভাগ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিদায় নেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের অসৎ কর্মকর্তারা পেতেন। এখনো এভাবেই চলছে, কেবল মানুষ বদলেছে, কিছু সাংবাদিক নামের চাঁদাবাজ প্রায় প্রতিদিন গিয়ে ওখানে হাত পাতে। আটক নৌকা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। একটি নৌকা ছাড়াতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লেনদেন হয়। টাকা নিয়ে পুলিশের কাছ নৌকা ছাড়ানোর তদবির করে এরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে গেল ৩১ জুলাই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পাড়ের স্তূপীকৃত বালু, পাথর, কার্গো, বার্জ ও দেশীয় নৌকা হতে উঠা-নামানোকালে টোল আদায়ের জন্য ইজারাদার নিয়োগ হয়। এ জন্য ৪২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ইজারামূল্যও প্রদান করেন ইজারাদার পূর্ব তেঘরিয়ার মো. ফারুক মিয়া। ১৪৩১ বাংলা সন পর্যন্ত ইজারা মেয়াদ এই ইজারাদারের। এই ইজারাদারের পক্ষ থেকে ধোপাজান-চলতি নদীর মনিপুর হাট এলাকায়ও টোলট্যাক্স আদায় করা হয়। প্রতি নৌকা থেকে এক থেকে আট হাজার টাকাও আদায় করেন এই ইজারাপক্ষ।
অন্যদিকে, বিআইডব্লিউটি’র পক্ষ থেকে গেল ১৪ জুলাই ‘সুনামগঞ্জ লঞ্চঘাট ও শুল্ক আদায় কেন্দ্র’ ঘাট নামে ঘাট ইজারা দেওয়া হয়। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ৪৮ লাখ টাকায় ইজারা হয় এই ঘাট। এই ঘাট ইজারা দেওয়া হয় মেসার্স জিনান এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানকে। এই ইজারাদার পক্ষও ধোপাজান-চলতি নদীর মনিপুরহাটি এলাকায় বিআইডব্লিউটি’এর নামে প্রতি ফুট বালুতে এক টাকা এবং পাথরের জন্য তিন থেকে পাঁচ টাকা ফুটে আদায় করে থাকে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একইভাবে শহরের নামধারী কয়েকজন ইজারাদার পৌরসভার পক্ষ থেকে টোল ট্যাক্স আদায় করেন চলতি নদীর মুখে। এছাড়া গৌরারং ও সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের নামের রশিদ দিয়ে বালু-পাথরের নৌকা থেকে টাকা আদায় হয়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে দেওয়া টোল আদায়ের ইজারাদার ফারুক মিয়ার কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনাদের কার্যাদেশে সুরমা নদীর পাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে মালামাল উঠা-নামানোকালে টোল আদায় করা, কিন্তু আপনারা ধোপাজান চলতি নদীর ভেতরে গিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা টোল আদায় করছেন। এটা ন্যায়সঙ্গত বা আইনসঙ্গত হচ্ছে কী-না ?
উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের ধোপাজান চলতি নদীর ডলুরা পর্যন্ত টোল ট্যাক্স ওঠানোর অনুমতি আছে। আর আপনারা যে আইন খুঁজছেন-পুলিশ যে প্রতি নৌকা থেকে বের হলেই পাঁচ হাজার-সাত হাজার টাকা তুলে, সেটা লেখেন না কেন। এক পর্যায়ে তিনি এখন আর ইজারার টাকা তুলছেন না জানিয়ে বললেন, তার এক আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর করেছেন ঘাট।
বিআইডব্লিউটি’এর ইজারাদার মেসার্স জিনান এন্টারপ্রাইজের পরিচালক শাহ রুবেল আহমদও ধোপাজান চলতি নদীর ভেতরের কিছু অংশ পর্যন্ত তার ইজারা এলাকার মধ্যে রয়েছে জানিয়ে জানান, তারা প্রতি ফুট বালু থেকে নির্ধারিত ২৫ পয়সা এবং পাথর থেকে এক টাকা ৩৩ পয়সা ইজারামূল্য নেন। যারা বেশি বলেছে, সত্য বলেনি।
পুলিশ সুপার আ.ফ.ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, চলতি নদীর মুখের বাঁশের আড় তুলে ফেলার কথা আমিও জেনেছি। কয়েকশ নৌকা একসঙ্গে ঢুকে গেছে। যেহেতু ধোপাজান চলতি নদীতে বালু-পাথর বৈধভাবে উত্তোলন বন্ধ, সেখানে বালু-পাথর থেকে টোল আদায়ের নামে টাকা আদায়ও সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। আমরা ধোপাজান-চলতি নদীতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আরো কঠোর ব্যবস্থা নেব।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, আমরা চাই ধোপাজান-চলতি নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে। কিন্তু সবাই মনে হয় চায় না। সরকার এতো দুর্বল নয় যে, সরকার চাইবে আর বন্ধ হবে না। আমার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে। সূত্র : ডেইলি বাংলাদেশ

No comments:
Post a Comment