সিলেটে দুর্গোৎসব উদযাপনে প্রস্তুত ৬১৭টি মণ্ডপ - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Monday, 16 October 2023

সিলেটে দুর্গোৎসব উদযাপনে প্রস্তুত ৬১৭টি মণ্ডপ


জাবেদ এমরান
: আগামী শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠান। দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত বৃহৎ হিন্দু উৎসবটি সারা বিশ্বে হিন্দু সম্প্রদায় দ্বারা পালিত হয়। বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসব হওয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ওড়িশা, বিহার, ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ (পূর্বাঞ্চল) এবং বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে উদযাপিত হয় প্রাচীনতম এ দুর্গোৎসব। এটি বাংলা বর্ষপঞ্জির আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব। যার মধ্যে শেষ পাঁচদিন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। আগামী শুক্রবার (২০ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে শুরু হবে দুর্গোৎসব। এরই মধ্যে পূজামন্ডপগুলো বর্ণিল কারুকাজে ও রঙ বেরং এর আলোর সমারোহে সাজানো হয়েছে। পূজার প্রধান আকর্ষণ ও উপাদান প্রতিমা প্রতিস্থাপনসহ যাবতীয় কাজ এরই মধ্যে সম্পন্নের পথে।


মন্ডপে মন্ডপে চন্ডীপাঠের মাধ্যমে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানানো হবে দেবী দুর্গাকে। প্রতিমা তৈরির পর অনেক পূজামন্ডপে চলছে প্রতিমা স্থাপন ও সাজসজ্জার বর্ণিল আয়োজনের শেষ পর্যায়ের কাজ। দেবীর আগমনী উৎসবকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা তৈরিতে কয়েকমাস আগ থেকে চলে নিরব প্রতিযোগিতা। প্রতিমা তৈরির শিল্পীরা দিনরাত কাজ করে মণ্ডপগুলোর চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি করে দিয়েছেন। 


সিলেট মহানগর ও উপজেলা জুড়ে শোভা পাচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ নানা সংগঠনের শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা সম্বলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণ।


নগরীর দাড়িয়াপাড়া, জামতলা, মির্জাজাঙ্গাল ও কালিবাড়িসহ বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শনকালে দেখা যায়, প্যান্ডেল, প্রতিমা স্থাপনের মঞ্চ, তোরণসহ সৌন্দর্য বর্ধন ও আলোক সজ্জার কাজ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট প্রতিরোধে প্রায় সব মণ্ডপে জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পূজা উদযাপন পরিষদ কর্তৃপক্ষ। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক নিজস্ব সেচ্ছাসেবী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন বলে তারা জানিয়েছেন।


সিলেট জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এবার সিলেট মহানগর ও জেলায় ৬১৭টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তার মধ্যে সার্বজনীন ৫৬৯টি, পারিবারিক ৪৮টি পূজার আয়োজন হচ্ছে। মহানগরীতে ১৫১টি পূজার মধ্যে সার্বজনীন ১৩৪টি ও পারিবারিক ১৭টি। জেলায় ৪৬৬টি পূজার মধ্যে সার্বজনীন ৪৩৫টি ও পারিবারিক ৩১টি।


জানা যায়, মহানগরীর ৬টি থানা এলাকায় এবার মোট ১৫১টি পূজামন্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন কোতোয়ালী থানা এলাকায় ৩৯টি, জালালাবাদ থানা এলাকায় ১৮টি, এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় ৩৮টি, শাহপরান থানা এলাকায় ২৩টি, দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকায় ১৫টি এবং মোগলাবাজার থানা এলাকায় ১৮টি। 


অন্যদিকে, জেলায় মোট ৪৬৬টি মন্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বজনীন ৪৩৫টি ও পারিবারিক ৩১টি। জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৬৬টি, বালাগঞ্জে ৩২টি, কানাইঘাটে ৩১টি, জৈন্তাপুরে ২৩টি, বিশ্বনাথে ২৫টি, গোয়াইনঘাটে ৩৯টি, জকিগঞ্জে ৯৮টি, বিয়ানীবাজারে ৫০টি, কোম্পানীগঞ্জে ২৮টি, ফেঞ্চুগঞ্জে ৪০টি ও ওসমানীনগর উপজেলায় ৩৪টি পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচদিন যথাক্রমে মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। এবার শ্রাবণ মাস মল মাস থাকায় কিছুটা দেরীতে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।


আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনা অমাবস্যার নাম মহালয়া। এর আগের পূর্ণিমা তিথি থেকে পিতৃপক্ষের সূচনা থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মহালয়ার দিন তর্পণ নিবেদন সম্পন্ন হয়। ১৪ অক্টোবর পবিত্র মহালয়া পালিত হয়। আগামী শুক্রবার (২০ অক্টোবর) মহাষষ্ঠী, ২১ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ২২ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ২৩ অক্টোবর মহানবমী ও ২৪ অক্টোবর বিজয়া দশমী।


দুর্গাউৎসবে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তায় প্রতিটা পূজামণ্ডপ ও তৎসম এলাকায় এবং বিপণী বিতানে বিপুল সংখ্যক পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তীক্ষ্ণ নজরদারি রয়েছে বলে পুলিশ প্রশাসন সূত্র নিশ্চিত করেছে। সিলেট জেলা ও মহানগরে পূজার নিরাপত্তায় কয়েক হাজার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। শুধু সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় কাজ করছে ১৭'শ পুলিশ।


এদিকে দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে পূজার কেনাকাটা। অনেক ফ্যাশন হাউজ দুর্গাপূজার কেনাকাটায় রেখেছে ছাঁড়ের ব্যবস্থা। নগরের মার্কেটগুলোতে সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলছে বলে জানিয়েছেন মধুবন, আল হামরা, রাজা ম্যানশন ও ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবছর বেচা বিক্রি বেড়েছে। গোলাপগঞ্জের লক্ষীপ্রসাদ থেকে পরিবার নিয়ে সিলেট কেনাকাটা করতে আসা সুনীল আচার্য জানান, আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। সে জন্য পরিবারের সবার জামাকাপড় কিনতে এসেছি। কাপড় কিনা শেষ, এবার জুতা কিনতে যাচ্ছি। তবে জিনিষপত্রের দাম একটু বেশি বলে তিনি জানান।


সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রজতকান্তি গুপ্ত জানান, সিলেটের ৬১৭টি মণ্ডপের প্রতিনিধি দলের সাথে ইতিমধ্যে দুইদফা সভা হয়েছে। একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকল পূজা কমিটিকে সরকারের গাইডলাইন মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূজা মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থা রাখা হবে। আমরা সবধরনের প্রস্তুত নিয়ে রেখেছি। জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্গাপূজা উদযাপনে সকল সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।


পূজোর প্রস্তুতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা জানান, সিলেট বিভাগে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা আয়োজনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এবার পূজোয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, জেনারেটরের ব্যবস্থা ও পরিদর্শন বই রাখার জন্য সকলকে অনুরাধ করেছেন। তিনি আরো বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এজন্য সকলে মিলে শারদীয় উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন করতে তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।


কথা হয় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. ইলিয়াছ শরীফের সাথে। তিনি সিলেট বাণীকে জানান, বিগত একমাস ধরে শারদীয় দুর্গপূজা উদযাপনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সদস্যরা কাজ করছে। দুর্গোৎসবে নিরাপত্তায় এসএমপিতে ১৭'শ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সকলকে সহযোগীতা করার আহবান জানান।

No comments:

Post a Comment

Pages