বিয়ে ও বাবার মৃত্যুতেও ছুটি না নিয়ে ৩৫ বছর টানা শিক্ষকতা - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Wednesday, 29 September 2021

বিয়ে ও বাবার মৃত্যুতেও ছুটি না নিয়ে ৩৫ বছর টানা শিক্ষকতা


শিক্ষাঙ্গন ডেস্ক :
সত্যজিৎ বিশ্বাস ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও অনুপস্থিত থাকেননি। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমনকি নিজের বিয়ে কিংবা বাবার মৃত্যুও তাকে স্কুলে যাওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। 


যশোরের মনিরামপুরের কুচলিয়া গ্রামের বাসিন্দা সত্যজিৎ। জেলার অভয়নগরের ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। সেখানে পড়ান নবম ও দশম শ্রেণির গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান এবং পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে।


তার এই গুণের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে এক ডজনের বেশি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আলোচিত হয়েছেন দেশজুড়ে। শিক্ষণ দক্ষতা দিয়ে জয় করেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর মন। 


গুণী এই মানুষটির কর্ম জীবনের সমাপ্তি ঘটছে আগামী মাসের ৯ তারিখ। 


তিনি বিদ্যালয়ে থাকছেন না এমনটি ভাবতেই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অবসর কিভাবে কাটাবেন ভেবে পাচ্ছেন না নিজেও।


১৯৮৪ সালে বিএসসি পাশের মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন সত্যজিৎ বিশ্বাস। দুই বছর পর ১৯৮৬ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। জীবনের প্রতিজ্ঞা ধরে রাখতে এরপর থেকে একদিনও কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেননি তিনি।


১৯৯০ সালে এক শুক্রবার রাতে নড়াইলের পঁচিশা গ্রামের আরতী বিশ্বাসকে বিয়ে করেন সত্যজিৎ। বিয়ের অর্ধেক কাজ সেরে নববধূকে রেখে শনিবার সকালে ২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে সময়মত স্কুলে আসেন তিনি। 


বিকেলে ছুটির পর আবার ২০ কি.মি. পাড়ি দিয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে বিয়ের বাকি কাজ সম্পন্ন করেন।


১৯৯৩ সালে কোনো এক সোমবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় আদর্শবান এই শিক্ষকের পিতা মাধব চন্দ্র বিশ্বাসের। 


তখন পাড়ার লোকজন ডেকে তিনি নিজের প্রতিজ্ঞার কথা বলেন। এরপর যোগ দেন ক্লাসে। বিকেলে ছুটি হলে বাবার সৎকার করেন তিনি।


একই প্রতিষ্ঠানে পদন্নোতি পেয়ে ২০১৫ সালে সহকারী প্রধান শিক্ষক হন সত্যজিৎ। সহকারী প্রধান হয়েও নিয়মিত নবম ও দশম শ্রেণির গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞান পড়ান তিনি।


বুধবার সকালে সরেজমিন ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায় তাকে। তখন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন গুণী এই মানুষটি।


কর্মক্ষেত্রে তিনি যেমন সফল তেমনি পরিবার প্রধান হিসেবেও। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক এই শিক্ষক। 


ছেলে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন। মেয়ে পশুপালনের ওপর স্নাতকোত্তর পড়ছেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর স্ত্রী আরতী বিশ্বাস গৃহিণী।


স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ বিশ্বাস বলেন, কর্মজীবনে যোগ দেওয়ার সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম জীবনে কোনোদিন স্কুল ফাঁকি দেব না। বিধাতা আমাকে এই কাজে সাহায্য করেছেন। 


কোনোদিন আমি অসুস্থও হইনি। সবসময় ঠিকমত হাজির হয়েছি স্কুলে। চাকরিজীবনে দুইদিন স্কুলে পৌঁছানোর পর কিছুটা অসুস্থবোধ করি। একদিন ক্লাস শুরুর আগে সমাবেশ চলা অবস্থায় মাথাঘুরে পড়ে যাই। সবাই মিলে আমাকে ধরে অফিসকক্ষে নিয়ে মাথায় পানি দেন। এরপরই আমি সুস্থ হয়ে যাই।


তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে আমি এমন। গ্রামের দিগঙ্গা কুচলিয়া হরিদাসকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। স্কুলজীবনে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে কোনোদিন অনুপস্থিত থাকিনি। অসুস্থতার জন্য দশম শ্রেণিতে দুইদিন অনুপস্থিত ছিলাম।


তিনি আরও বলেন, স্ত্রী প্রথম দিকে একটুআধটু রাগ করতেন। এরপর আমার দেশসেরা শিক্ষক হওয়ার খবর জানলো। 


২০১৯ সালে ডেইলি স্টার পত্রিকা থেকে আমাকে পুরস্কার দিল। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে বিমানে ঢাকায় গেলাম। তারপর থেকে সে নিজেও খুশি।


অবসর জীবন কীভাবে কাটাবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তখন বাড়িতে বসে কর্মজীবনের কথা ভাবা ছাড়া গতি নেই। আমার গ্রামের মানুষও ঠিকভাবে আমাকে চেনেন না। মনিরামপুর উপজেলায় বাড়ি হলেও আমার সব পরিচিতি স্কুলকে ঘিরে।


ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া খাতুন বলে, স্যার আমাদের গণিত পড়ান। কোনো সময় আমাদের ওপর রাগ করেন না। কোনো কিছু না বুঝলে বারবার বুঝিয়ে দেন। স্যারকে পেয়ে আমরা গর্বিত। স্যার আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।


মনিরাপুরের হরিদাসকাটি ইউনিয়নের কুচলিয়া ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রনব বিশ্বাস বলেন, সত্যজিৎ সম্পর্কে আমার ভাই। 


শিক্ষকতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে মেশার সুযোগ পাননি তিনি। শিক্ষক হিসেবে সত্যি তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯০ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি এখানে যোগ দিই। সেই থেকে সত্যজিৎ বিশ্বাস আমার সহকর্মী। কোনোদিন দেখিনি ঝড়বৃষ্টি বা অসুস্থতার কথা বলে তাকে ছুটি নিতে। কোনো বছর ঐচ্ছিক ছুটিও কাটাননি তিনি। ২০১৫ সালে সত্যজিৎ বিশ্বাসকে সহকারী প্রধান হিসেবে পেয়েছি। সার্বিক কাজে তিনি আমাকে সহযোগিতা করেন।


নজরুল ইসলাম বলেন, আগামী মাসের ৯ তারিখ সত্যজিৎ বিশ্বাসের কর্মজীবনের শেষ দিন। তাকে ছাড়তে হবে এটা ভেবে খারাপ লাগছে। তারপরও তাকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে চাই। আমি তার অবসর জীবনের কল্যাণ কামনা করি।


No comments:

Post a Comment

Pages