প্রেস-বিজ্ঞপ্তি : সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৪ প্রতারকের খপ্পরে পড়ে ব্যবসায়ী রুহেল আহমদ সর্বস্বান্ত হয়ে প্রতারকদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শস্তির দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের কিসমত মাইজভাগ ফকিরপাড়া গ্রামের তিন ভাই রাজু, সুমন ও হাসনাত প্রতারণা করে তার ৫৬ লক্ষ টাকা আত্নসাৎ করে। তাদের সহযোগিতা করে হেতিমগঞ্জ গ্রামের মুহিব মিয়া। এখন টাকার জন্য চাপ দিলে তারা উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলার লক্ষীপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় হেতিমগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী রুহেল আহমদ।
শনিবার ২০ মার্চ সিলেট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
রুহেল আহমদ পশ্চিম নিমাদল গ্রামের ছয়ফুল ইসলাম আরব আলীর ছেলে।
লিখিত বক্তব্যে রুহেল আহমদ বলেন, স্থানীয় হেতিমগঞ্জ বাজারে ব্যবসা সূত্রে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের কিসমত মাইজভাগ ফকিরপাড়া গ্রামের মরহুম আব্দুল হাই চৌধুরীর ছেলে সুমন আহমদ চৌধুরী (৩৫), আবুল খায়ের চৌধুরী উরফে রাজু আহমদ (৩৭) ও আবুল হাসনাত চৌধুরী (৩৯) এর সাথে তার পরিচয় হয়।
তারা হেতিমগঞ্জ বাজারে ‘রাণী কসমেটিকস এন্ড টেলিকম’ ‘মেসার্স ফেমাস বন্ত্র বিতাণ’ ‘মেট্রো মোবাইল শপ’ সহ বিভিন্ন নামে-বেনামে ব্যবাস করতেন। ব্যবসার জন্য তারা তার থেকে টাকা নেয় প্রতি লাক্ষে ৩ হাজার টাকা লাভে এবং যেকোন সময় মূলটাকা ফেরত দেয়া হবে। ‘‘জাগরণ ঋনদান সমবায় সমিতি’ করে চওড়া সুদে ঋণ দান করতো তারা। তারা তাকে প্রস্তাব দেয় ঋণদান সমিতিতে ১ লক্ষ টাকায় মাসে ৩ হাজার টাকা মুনাফা পাওয়া যাবে এবং যেকোন সময় মূল টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। তাদের ছলছাতুরি ও বারবার অনুরোধে তিনি তাদের টাকা দিতে সম্মত হন রুহেল আহমদ।
এরপর ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪টি চেকে মোট ১২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা নেয় তারা। পরে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আরো ৯টি চেকে এবং নগদে মোট ৫৬ লক্ষ টাকা নেয় তারা ৩ ভাই। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২ মার্চ টাকা নেয়ার পর তারা বদলে যায়। তারা ছলচাতুরী শুরু করে এবং কথা বলতে গেলেই গড়িমশি করে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তাদের প্রতারনা বুঝতে পেরে রুহেল আহমদ শালিস ব্যক্তিদের দ্বারাস্ত হন। বিচার পঞ্চায়েতের চাপে রাজু আহমদ গত ২০১৭ সালের ২৫ মে একটি চুক্তিপত্র এবং পরবর্তিতে ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর সালিশ বৈঠকে নিজেই টাকা ফেরত দেয়ার একটি অঙ্গিকারনামা করে টাকার পরিমান উল্লেখ করে ৭টি চেক প্রদান করে। এই অবস্থায় ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাজু ফ্রান্স পালিয়ে যায়। পরে জানা যায়, ফ্রান্স যাওয়ার জন্যই সে এসব করেছে যাতে নিজেকে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো যায় এবং সময়ক্ষেপণ হয়।
এরপর টাকার জন্য সালিশগণ, এলাকাবাসী ও তাদের পরিবারের নিকট ছুটাছুটি করেও কোন সুফল পাওয়া যায়নি। শালিসগণের চাপ থেকে রক্ষা পেতে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে টাকা দিচ্ছি-দিব বলে জানিয়ে বিভ্রান্ত করতে থাকে। কোন ফল না হওয়ায় তাদের বাড়িতে শালিস ব্যক্তিদের নিয়ে তাদের মা ও বাড়ির সদস্যদের সাথে দেখা করলে তাদের মা এক সপ্তাহের সময় নেন কিন্তু মাসের পর মাস চলে গেলেও তিনি কিছুই জানান না। বরং দেখা করার সুযোগও দেন না এবং গেলে গালাগাল করেন। পরে বাধ্য হয়ে তাদের মসজিদের পঞ্চায়েতে জানাই।
রুহেল আরো বলেন, প্রতারক রাজু, সুমন ও আবুল হাসনাতের পরিবারের সাথে কথা বলে কোন সদুত্তর পাননি। পরে ২০১৮ সালে টাকা উদ্ধারে রুহেল গোলাপগঞ্জ মডেল থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জের নিকট মৌখিক ভাবে জানালে তিনি উভয় পক্ষকে ডেকে আনেন। তখনও তারা টাকা দিবে বলে অঙ্গিকারাবদ্ধ হয়। কিন্তু থানা থেকে বেরিয়ে আসার পর আগের মতই কালক্ষেপন করতে থাকে। পরে বাধ্য হয়ে তাদের দেয়া ডিজঅনার হওয়া ৭টি চেকের বিপরীতে ৭টি মামলা করেন রুহেল আহমদ।
তাদের পেশাদার প্রতারক উল্লেখ করে তিনি বলেন, গোলাপগঞ্জ মডেল থানাসহ সিলেটের বিভিন্ন থানায় তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। ৭টি চেক ডিজঅনার মামলা করার পর ফ্রান্স থেকে রাজু ও দেশে সুমন আহমদ এবার নিজেরাই বিষয়টি আপোষ নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে থাকে। তাদের ভাই আবুল হাসনাত তখন দুবাই ছিলেন এবং সালিশ ও স্বাক্ষীগণের সাথে ফোনে কথা বলে আপোষনামায় তিনি দুবাই থেকে ফিরে স্বাক্ষর করবেন বলে জানান। তারাই শালিসদের একত্রিত করেন।
তাদের কথা মতো বিগত ২০১৯ সালের ৩০ জুন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি এডভোকেট কবির আহমদ বাবরের বাড়ীতে শালিসগণের সম্মূখে টাকা ফেরত দেয়ার আপোষনামায় সুমন আহমদ স্বাক্ষর করেন। ১ হাজার টাকার স্টাম্পে দুই সেট আপোষনামা করে দুই পক্ষকে দেয়া হয়। আপোষনামার শর্ত মতে তারা রুহেল আহমদকে ৬ লক্ষ টাকা প্রদান করে এবং বাকি টাকা পরিশোধের অঙ্গিকার করে টাকার পরিমান উল্লেখ করে ৪টি চেক প্রদান করে। আপোষনামার শর্তানুসারে চেক ডিজঅনারের ৭টি মামলার মধ্যে একটি মামলার রায় হয়ে যাওয়ায় বাকি ৬টি মামলা প্রত্যাহার করেন।
তিনি আরও বলেন, এর কিছুদিন পরে প্রতারক সুমন ও তার ভাইদের পক্ষের একজন মধ্যস্থতাকারী হেতিমগঞ্জ গ্রামের সুনাহর আলীর ছেলে মুহিব মিয়া (৪৫) বিষয়টি প্রায় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এবং যা অবশিষ্ট রয়েছে তার সুষ্টু সমাধান করে দেয়া হচ্ছে বলে ৩০ জুনের আপোষনামার সুমনের দেয়া ৪টি চেক এবং অঙ্গিকারপত্রের মূল কপি নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি মুহিব মিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক প্রতারনা মামলা রয়েছে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় তিনি জেলখাটা আসামী। পরে মুহিব মিয়াকে ৪টি চেক ও অঙ্গিকারপত্র ফিরিয়ে দেয়ার কথা বললে সে ফিরিয়ে না দিয়ে উল্টো হুমকী দেয়।
এদিকে, চেক ডিজঅনার মামলা প্রত্যাহার এবং ৩০ জুনের আপোষনামা ও ৪টি চেক নিয়ে যাওয়ার পর তারা গত ২ ফেব্রুয়ারি উল্টো রুহেল আহমদের বিরুদ্ধে ভুয়া অঙ্গিকারনামা, জাল চুক্তি সম্পাদন ও কোন টাকা লেনদেন হয়নি অভিযোগ করে আদালতে মামলা করে দেয়। তাদের মিথ্যা বানোয়াট মামলায়, এডভোকেট করিম আকবরী স্বাক্ষর করেছেন উল্লেখ করে তাকেও আসামী করে। অথচ এডভোকেট করিম আকবরী কোন চুক্তি পত্রেই স্বাক্ষর করেননি। তারা যে মিথ্যা অভিযোগ করেছে তার আরো প্রমান হলো, তারা অভিযেগে বলেছে গত ২৫/০৫/১৭ তারিখের চুক্তিপত্র ও ২০/১০/১৭ তারিখের অঙ্গিকারনামায় স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তাদের মা রানী আক্তারকে দেয়া তাদের পাওয়ার অফ এটর্নি থেকে স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগে উল্লেখ করেন।
কিন্তু তাদের মাকে তারা পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়েছে ২৭/১১/২০১৭ তারিখ। তাহলে ২৫/০৫/২০১৭ বা ২০/১০/২০১৭ তারিখে স্বাক্ষর জাল হলো কিভাবে ? মূলত রুহেল আহমদকে হয়রানি ও টাকা আত্নসাত করতে তারা এই ভূয়া মামলা করেছে। তাদের একের পর এক প্রতারানা, জালিয়াতির কারণে বাধ্য হয়ে গত ৯ মার্চ রুহেল আহমদ সিলেট আদালতে প্রতারক ৩ ভাই সুমন আহমদ, আবুল খায়ের রাজু ও আবুল হাসনাত এবং চেক, চুক্তিনামা আত্নসাত ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য মুহিব মিয়া কে আসামী করে মামলা করেন। আদালত মামলা আমলে নিয়ে থানা পুলিশকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
পরে গোলাপগঞ্জ মডেল থানা গত ১৩ মার্চ মামলাটি আমলে নেয় (মামলা নং-১৮)।
তাদের একেরপরএক প্রতারনায় রুহেল আহমদ এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে বলেন, তার অতি মূল্যবান জমি বিক্রি, প্রবাসী ৪ ভাইয়ের প্রেরিত অর্থ এবং বালু পাথর সরবরাহের ব্যবসা ‘জননী এন্টারপ্রাইজ’ থেকে সঞ্চিত অর্থ তাদের দিয়েছিলেন। বিপুল ক্ষতি তার উপর তাদের মিথ্যা মামলায় তিনি হয়রানির শিকার। রুহেল আহমদ টাকা ফেরত পেতে মামলা করায় তারা এখন তাকে প্রাণনাশের হুমকীসহ বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। রুহেল পুলিশ, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট অবিলম্বে ৪ প্রতারককে গ্রেফতার করে দৃষ্টিন্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, টাকা উদ্ধার এবং সাধারণ নিরীহ মানুষকে তাদের প্রতারনার হাত থেকে রক্ষা করার আবেদন জানান।

No comments:
Post a Comment