বাবর হোসেন : মঞ্জু মিয়ার শেষ বিদায়কালে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কোনো নেতা উপস্থিতি না থাকায় সাংবাদিক এম এ রহিমের আক্ষেপ ও ক্ষোভ রয়েছে। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ব্যতীত জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কারো উপস্থিতি ছিলেন না মঞ্জু মিয়ার জানাজার নামাজে।
এম এ রহিম বর্তমানে কাজ করেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ৫২-তে। প্রিন্ট ও অনলাইন দুটোই আছে পত্রিকাটির। রহিম দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন দৈনিক মানবজমিনে। ওয়ান ইলেভেনর সময় একটি মামলার অজুহাতে পত্রিকার কতৃপক্ষ তাকে অব্যাহতি দিয়েছিলো। সেই মামলার দায় থেকে রহিম খালাস পেলেও চাকরি ফিরে পাননি। রহিম লিখেছেন- বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর মঞ্জু মিয়া কাউকে না পেয়ে একাই সিলেটের রাজপথে প্রথম প্রতিবাদ মিছিল শাহী ঈদগাহ থেকে বের করেছিলেন। বেশিদূর এগোতে পারেননি, পোশাকধারী হায়েনাদের কবলে পড়ে পালাতে হয়েছিল তাকে। ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় রহিমের বয়স তেমন একটা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি মঞ্জু মিয়ার ভালোবাসা এবং প্রতিবাদ করার সাহসের গল্পটি রহিম যার কাছ থেকে শোনেছিলেন তার নামটি তিনি উল্লেখ করতে পারেন নি।
তিনি হচ্ছেন এডভোকেট কমরেড মালেক। আজ আর দুনিয়াতে নেই। পরকালে চলে গেছেন দু মাস আগে। রহিম নিজেই স্বীকার করেছেন, একটি বাস্তব সত্য কথা তিনি লিখতে পারেন নি। আর তা হল- মঞ্জু মিয়ার কাছে আওয়ামী লীগের অনেক ঋণ রয়ে গেছে যা পরিশোধহীন। মঞ্জু মিয়া তার জীবন-যৌবন সব কিছুই দিয়েছেন আওয়ামী লীগের জন্য। বিনিময়ে তেমন কিছুই পাননি। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সিলেটে আরেকটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছিলো টিলাগড়ের আজিজুর রহমান মানিক মিয়ার নেতৃত্বে। সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের বড় ভাই ছিলেন মানিক মিয়া। আজাদের আরেক চাচা ছিলেন এডভোকেট শফিকুর রহমান। তিনিও একজন শক্ত আওয়ামী লীগার ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে মানিক মিয়া ও এডভোকেট শফিকুর রহমান অনেক কঠিন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তখন থেকেই তাদের সাথে সাথে ছিলেন মঞ্জু মিয়া। আমাদের চোখের দেখা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সামরিক শাসনের সময় মঞ্জু মিয়া ছাড়া আওয়ামী লীগের মাইক সচল হতো না। মিছিল মিটিং এর ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টা আগে মাইক চালিয়ে মূল বক্তারা যে বক্তব্য দিবেন, সেই বক্তব্য দিয়েই চালিয়ে যেতেন মঞ্জু মিয়া। সাধারণ মানুষ সহ দলীয় কর্মীদের জড়ো করে রাখার পর নেতারা এসে বক্ততা করতেন কিন্তুু এর আগেই মঞ্জু মিয়ার মুখ থেকেই সব কিছু শোনা হয়ে গেছে।
সেই মঞ্জু মিয়ার চরম দুর্দিনে একবার শোনে ছিলাম দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্য পেয়েছিলেন। সম্ভবত সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের প্রচেষ্টায়। মনিরুল হক চৌধুরী নামে আওয়ামী লীগের একজন সভাপতি ছিলেন তিনি মঞ্জু মিয়াকে অনেক সহযোগীতা করতেন। সিরাজ উদ্দিন আহমদ, যাকে রূপবান সিরাজ নামে অনেকেই ডাকতেন। শ্রীরামপুর বাড়ি। তিনিও মঞ্জু মিয়াকে আর্থিকভাবে দেখা শোনা করতেন।লন্ডন প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক অজয়পাল, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ কবি মহিউদ্দিন শীরু ভাইকেও দেখতাম মঞ্জু মিয়ার খোঁজ খবর নিতে।
আজ মনে পড়ছে সিনিয়র ফটো সাংবাদিক আতাউর রহমান আতা মাঠে ময়দানে ধাওয়া খেয়ে কোথাও জড়ো হলে মঞ্জু মিয়া সেখানে থাকলে সিংগাড়া হাতে তোলে দিতেন। কালের কন্ঠের ফটো সাংবাদিক আসকার আমিন রাব্বির পিতা সে সময়কার দৈনিক খবর পত্রিকার সিলেট প্রতিনিধি খায়রুল আমিন লস্কর তারও ডাক নাম ছিলো মঞ্জু। তিনিও মঞ্জু মিয়াকে রেখে কিছু খেতেন না মাঠে ময়দানে। দুর্দিনে আওয়ামী লীগের জন্য মঞ্জু মিয়ার অবদান অনেক ছিলো কিন্তু দলের কাছ থেকে সুদিনে মঞ্জু মিয়া তেমন কিছু পেয়েছেন বলে মনে হয়না। মঞ্জু মিয়ার পরিবারের একটি বুকষ্টল ছিলো সিলেট রেল ষ্টেশন প্লাটফর্মের ভিতরে।
তার বড়ভাই এবং মিলন নামের আরেক ছোটভাই সেটা চালাতেন। যে সময় কোথাও কিছু না পেলে মঞ্জু মিয়া পায়ে হেটেঁ চলে যেতেন রেল ষ্টেশনে। তাঁকে দেখলেই তার ভাইরা বুঝে ফেলতেন আজ আর কোথাও কিছু পাওয়া যায়নি। তাইতো মঞ্জু মিয়ার রেল ষ্টেশনে আগমন। টাকা পেলেই সিগারেটে টান দেয়ার ষ্টাইলই ছিলো আলাদা। পাঞ্জাবী পরিহিত মঞ্জু মিয়াকে দূর থেকে দেখলেই বুঝা যেতো পকেটে কিছু আছে কি না।
আওয়ামী লীগের সেই মঞ্জুকে একনামেই চিনতো সবাই। আজ তিনি আমাদের কাছ থেকে চলে গেছেন। আমরা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি আর দোয়া করি আল্লাহ যেনো মঞ্জু মিয়াকে জান্নাতবাসী করেন।
লেখক- সাংবাদিক

No comments:
Post a Comment