জাবেদ এমরান : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সিলেটে নেমে এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখলাম, বৃষ্টির কারণে পানি জমে রয়েছে। এই বৃষ্টির পানির জন্য সুনামগঞ্জের অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এছাড়া দেশের সব নগরেই ভূগর্ভূস্থ পানির স্থর দিনদিন নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচী নিয়েছি। তাতে যেমন আমরা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে পারবো তেমনি জলাবদ্ধতারও নিরসন হবে।
নদ-নদীতে প্লাস্টিকের স্থর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় স্কুলগুলোতে উদ্যোগ নিয়ে শিশুদের পরিবেশের বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
শনিবার (২ মে) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদী পূণঃখনন কাজ উদ্বোধন শেষে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের ভেতরে যারা শিল্প উদ্যোক্তা আছেন, তাদের নিয়ে আমরা বসেছি। যাতে তারা নতুন নতুন কারখানা তৈরি করতে পারেন। এতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়রা চাকরি পাবেন। শুধু তাই, যেসব দেশের শ্রম বাজার বন্ধ আছে সেগুলোও আমরা চালু করার ব্যবস্থা করছি। অতিদ্রুতই সেসব দেশে মানুষ যাওয়া আবার শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, সারাদেশে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করবো। আমরা শুরু করেছি। আজ এই বাসিয়া খাল পূণঃখনন কাজের উদ্বোধন করলাম। এই খাল খনন শেষে দুই পারে আমরা ৫০ হাজার গাছ লাগাবো। সেখানে স্থানীয়রা প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবেন। আমরা ফলজ গাছও লাগাবো। বাসিয়া পুণঃখনন শেষ হলে সরাসরি ৮০ হাজার কৃষক উপকৃত হবে। আর পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে আরো অন্তত দেড় লাখ মানুষ। এতে বছরে ৭ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। আমরা দেশের ৬০ জেলায় খাল খনন শুরু করেছি।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিবো। আমরা তা শুরু করেছি। আমরা কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার কাজও শুরু করেছি। এই কার্ড দিয়ে তারা যেমন সার কীটনাশক বীজ পাবেন তেমনি কৃষি ঋণও পাবেন। ইতিমধ্যে আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করেছি। ইমাম মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের আমরা ভাতা দেওয়া শুরু করেছি।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার ‘খাল কাটা কর্মসূচীর’ আওতায় সর্বশেষ এই বাঁসিয়া নদীটি খনন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর তার সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে নদীটি পুনরায় খনন হতে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাসিয়া নদীর প্রায় সাড়ে ২৩ কিলোমিটার অংশ ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হবে। এর ফলে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার প্রায় ৯০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পে নদীটি প্রায় দেড় থেকে দুই মিটার গভীর করা হবে। উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বাসিয়া নদীর পাড়ে বৃক্ষরোপণ করেন এবং স্থানীয় জনগণের সাথে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করেন।
এর আগে সিলেট এসে নগরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মেঘাপ্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর নগর ভবনে সুধি সমাবেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এতে তিনি বলেন, নির্বাচনের আমি যখন সিলেট এসেছিলাম তখন বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ সাড়ে ৯ ঘন্টা সময় লাগে। অথচ সিলেট থেকে বাইরোডে ঢাকা যেতে ১০ ঘন্টা সময় লাগে। তাই আমি সিলেট-ঢাকা মহানসড়কের উন্নয়নের কথা বলেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণ কাজের জমি অধিগ্রহণে ১১টি জায়গায় সমস্যা ছিলো। এজন্য কাজ আটকে ছিলো। এই সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারবো। কাজ শেষ হতে দেরি হবে। তবে শুরু হলে তো শেষও হবে। এতে মানুষের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব হবে।
কেবল সড়কপথ নয়, সরকার রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগও নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা ঢাকা-সিলেট রেল রেলপথেকে ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।
সিলেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এছাড়া সিলেট হাসপাতালকে (ওসমানী হাসপাতাল) আমরা ১২শ’ শয্যার উন্নীতের চেষ্টা করবো।
তিনি বলেন, কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, আমাদের মতো দেশগুলোকে রোগ প্রতিরোধেও সচেতন হওয়া দরকার। এজন্য আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ করবো। যাদের ৮০ ভাগ হবেন নারী। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করবেন। কোন খাবার বেশি খেলে কোন রোগ হয় এসব ব্যাপারে অবগত করবেন।
বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। দরকার হলে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করতে চাই। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টেরও চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে। কিন্তু এটি সচল নেই। আমরা এটি দ্রুত সচল করার চেষ্টা করছি। যাতে তরুণরা এখানে কাজের সুযোগ পায়। ভকশেনাল সেন্টারগুলো আপডেট করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
তিনি বলেন, যে প্রতিশ্রুতি আমরা দেশের মানুষকে দিয়েছিলাম তা আমরা বাস্তবায়ন করা শুরু করেছি। আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালু করেছি। শিশুদের খেলাধুলায় আকৃষ্ট নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস চালু করেছি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধানসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জি কে গউছ ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেত্রীবৃন্দসহ বিপুল জনসাধারণ।

No comments:
Post a Comment