কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Saturday, 23 May 2026

কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত


সময় ডেস্ক :
উন্নত জীবনের স্বপ্ন, সংসারের অভাব ঘোচানোর আকাঙ্ক্ষা আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশা নিয়ে মাত্র চার মাস আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের যুবক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ঋণ করে বিদেশে যাওয়া সেই তরুণ আর জীবিত ফিরে এলেন না। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার। 


একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে তার পরিবার। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।


নিহত জাহাঙ্গীর হোসেন কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে।


পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান জাহাঙ্গীর। এরপর মা জাকিয়া বেগম তিন সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। জীবিকার তাগিদে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে অনেক কষ্টে সন্তানদের বড় করেন তিনি। 


দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অনটন আর অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতেই বড় হয়েছেন জাহাঙ্গীর। পরিবারের হাল ধরতে এবং ছোট ভাই-বোন ও নিজের স্ত্রী-সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।


স্বজনদের ভাষ্য, বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় চার মাস আগে রাশিয়ায় যান জাহাঙ্গীর। পরিবারের সদস্যরা জানতেন, তিনি সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। 


তবে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তিনি রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যুক্ত হলেন, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। পরিবারের দাবি, গত সোমবার (১৮ মে) ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি বার্তা তারা এখনও পাননি।


জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর প্রথমে পরিবার জানতে পারে তার সহকর্মীদের মাধ্যমে। বৃহস্পতিবার (২২ মে) রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে কর্মরত টাঙ্গাইলের মৃদুল নামে এক বাংলাদেশি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর থেকেই পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।


শনিবার সকালে জাহাঙ্গীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িজুড়ে শোকের মাতম চলছে। বাড়ির উঠানে বসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা জাকিয়া বেগম। ছেলের স্মৃতি মনে করে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। কোনোভাবেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছে না। স্বামীর মৃত্যুর সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী মাসুদা হোসেন। স্বামীর ব্যবহৃত কাপড় আর ছবি বুকে জড়িয়ে নির্বাক বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।


এদিকে বাবার মৃত্যুর খবর বুঝে উঠতে না পারলেও ঘরের ভেতর-বাইরে ঘুরে বাবাকে খুঁজছে আড়াই বছরের শিশু সন্তান আযান হোসেন। সন্তানের এমন দৃশ্য দেখে আরও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন স্বজনরা। বাড়িতে আসা প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।


নিহতের ছোট ভাই জাবেদ হোসেন বলেন, “ভাই পরিবারের জন্য অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে তাকে পাঠানো হয়েছিল। আমরা জানতাম সে ভালো কোনো কাজে আছে। হঠাৎ ভিডিও বার্তায় তার মৃত্যুর খবর পাই। এখন আমরা কী করবো বুঝতে পারছি না। কীভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, সেটাও আমাদের জানা নেই।”


স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, জাহাঙ্গীর ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী একজন যুবক। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ছোট বয়স থেকেই সংগ্রাম করেছেন তিনি। তার মৃত্যুর খবরে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “জাহাঙ্গীর খুবই ভদ্র ছেলে ছিল। পরিবারের জন্য অনেক কষ্ট করত। বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করবে এটাই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি।”


এ বিষয়ে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, “বিষয়টি আমরা শুনেছি। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।”


এদিকে জাহাঙ্গীরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।


No comments:

Post a Comment

Pages