জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের চেহারা পালটে যাবে : ডা. শফিকুর রহমান - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Saturday, 7 February 2026

জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের চেহারা পালটে যাবে : ডা. শফিকুর রহমান


জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক 
: জামায়াতে ইসলামীর আমীর. ডা শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা দায়িত্ব পেলে পাঁচ বছরে দেশের চেহারা পালটে যাবে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবো। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভুমির সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তরুণ প্রজন্ম ও মা-বোনদের স্বপ্নের যে নতুন বাংলাদেশ তা পাঁচ বছরেই ধরা দেবে। জনগণের টাকা যারা চুরি করেছে তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। যে দেশেই থাকুক নিয়ে আসা হবে। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় সেই টাকা ফেরত দিয়ে দেয় তবে তা বিবেচনা করা হবে।


শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


আমীরে জামায়াত বলেন, সিলেট হচ্ছে দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। হযরত শাহজালাল (র.) তৎকালীন জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিলেন। আমরা তারই উত্তরসূরী। বাংলাদেশ গত ৫৪ বছর ধরে জুলুমের রাজনীতি চলছে। সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে ২০২৪ এর ৫ আগস্টের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরই আমরা বলেছিলাম, দল হিসেবে জামায়াত কোন জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে না। আমরা ক্ষমা করে দিয়েছি। আমাদের নেতাকর্মীরা কথা রেখেছেন। দল হিসেবে আমরা প্রতিশোধ নেইনি। মামলা বাণিজ্য করিনি। কিন্তু অনেকে মামলা বাণিজ্য করেছে। জুলুম করেছে। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকলে সে আইনের সহায়তা নিতে পারবে।


শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে জনসভার কার্যক্রম শুরু হলেও এর আগেই দুপুর থেকে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা মাঠে আসতে থাকেন। ৩টার আগেই আলিয়া মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এরপর আশপাশের রাস্তা লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। এবারই প্রথম সিলেটে জামায়াতের জনসভায় বিপুলসংখ্যক নারীরা অংশ নেন। তাদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া জনসভা মঞ্চে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন।


বক্তব্য শেষে জামায়াত আমীর সিলেটের ৬টি ও সুনামগঞ্জের ৩টি আসনের জামায়াত ও জোটের প্রার্থীদের হাতে স্ব স্ব দলীয় প্রতীক তুলে দেন এবং তাদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি। জনসভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়, ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রার্থীগণ বক্তব্য রাখেন। এর আগে জামায়াত আমীর হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে পৃথক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন।


সিলেটে খনিজ সম্পদে ভরপুর উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেটের খনিজ সম্পদের হিস্যা সিলেটবাসী পাচ্ছে না। সিলেটের সব এলাকায় এখনও গ্যাস যায়নি। বিদ্যুৎ যায়নি সব জায়গায়। নদীগুলো মেরে ফেলা হয়েছে। মদ গাঁজা- জুয়ায় ছেয়ে গেছে সিলেট। আমরা দায়িত্ব পেলে এগুলো বন্ধ করবো। কেবল নদী খনন নয়, নদীবান্ধব হবে বাংলাদেশ। এই দেশে কেউ আর চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কোন অফিস আদালতে কারো ঘুষ নেওয়ার সাহস ও সুযোগ হবে না।


দেশের বিগত দিনের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ডাঃ শফিকুর রহমান বলেন, ৫৪ বছরে দেশের টাকা লুট হয়েছে। কেউ ফেরেস্তা ছিলেন না। সবাই চুরি করেছেন কেউ কম বা কেউ বেশি। যারা জনগনের টাকা চুরি করেছে আমরা দায়িত্ব পেলে তাদের শান্তি দেবো না। তাদের পেটের ভেতর থেকে টাকা বের করে আনবো। দুর্নীতি বন্ধ হলে, চুরি বন্ধ হলে উন্নয়নও হবে।



সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিলেটে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। কেবল নামেই আন্তর্জাতিক, কিন্তু পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এখানে নামে না। আমরা নামে নয় কাজে এই বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করবো। সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তর করা হবে। ঢাকা-সিলেট ৬ লেনের ঝিমিয়ে পড়া কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডুয়েল গেজ রেলপথে পরিনত করে বুলেট ট্রেন সংযুক্ত করা হবে।


জামায়াত আমীর বলেন, আমরা কৃষকদের কাছে সরঞ্জাম তুলে দেবো। কৃষিপণ্যের বাজার নিশ্চিত করা হবে। জেলেদের হাতে জাল দেওয়া হবে। জাল যার জলা তার হবে। চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে।


নিজের এক্স একাউন্টের একটি পোস্ট নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, একদল মা বোনদের সম্মান দিতে জানে না। আমি এর প্রতিবাদ করেছি এজন্য তারা আমার দিকে মিসাইল ছুড়েছে। আমার এক্স একাউন্ট হ্যাক করে মা-বোনদের নিয়ে অপমাজনক পোস্ট দিয়েছে। এখন তারা কী বলবে, চোরের তো ধরা পড়েছে। কিন্তু এখন তারা চোরের পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। একেই বলে চুরের মায়ের বড় গলা। আমি তাদের মাফ করে দিয়েছি।


তিনি বলেন, রাজার ছেলে রাজা হবে সেই সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই। যোগ্যতা থাকলে চা শ্রমিকের ছেলেও যেনো যথাযোগ্য স্থানে অধিষ্ঠিত হতে পারে আমরা সেই সংস্কৃতি চালু করতে চাই। চাহিদার তুলনায় সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা তুলনামুলক কম। আমরা নির্বাচিত হলে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতন ভাতা নিশ্চিত করবো। এরপরও যারা ঘুষ খাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।



সবশেষে তিনি বলেন, আমি এই সিলেটের সন্তান। আমি এখানে বড় হয়েছি। আজ জামায়াতের আমীর হিসেবে নয়, আপনাদের একজন হিসেবে এখানে দাঁড়িয়েছি। আমাদের একবার সুযোগ দেন। আমরা দেশের মালিক বনবো না। আপনাদের চৌকিদার হবো। যার যা মর্যাদা তা নিশ্চিত করবো। তিনি দেশ সঠিক পথে পরিচালনার জন্য গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে ভোট দেয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।


জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সিলেট মহানগরী আমীর ও মহানগর ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং মহানগর নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও জেলা সেক্রেটারী সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী জয়নাল আবেদীনের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত জনসভায় সিলেটের ৬টি আসন ও সুনামগঞ্জের ৩টি আসনের জোটের প্রার্থীগণ উপস্থিত ছিলেন।


বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জাগপার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা।


রাশেদ ইকবালের পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সুচীত জনসভায় বক্তব্য রাখেন- জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর ও সিলেট-৬ আসনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমীর ও সিলেট-১ আসনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান, জামায়াতের সিলেট অঞ্চল টীম সদস্য হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, সুনামগঞ্জ জেলা আমীর ও সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান, সিলেট জেলা নায়েবে আমীর হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান, অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান, সাবেক দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, খেলাফত মজলিসের সিলেট মহানগর সভাপতি হাফিজ মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান ও সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শাহীন আহমদ।


জনসভা শেষে ১১ দলীয় জোট মনোনীত সিলেট-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সিলেট-২ আসনের খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলীর হাতে দেয়াল ঘড়ি, সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর হাতে রিক্সা, সিলেট-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী জয়নাল আবেদীনের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সিলেট-৫ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রাথীয় মুফতি আবুল হাসানের হাতে দেয়াল ঘড়ি ও সিলেট-৬ আসনে জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। এছাড়া জনসভায় সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খানের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী এডভোকেট শিশির মনিরের অনুপস্থিতিতে তার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক গ্রহণ করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াত প্রার্থী এডভোকেট শামছ উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম মাদানীর হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।



জনসভায় উপস্থিত ছিলেন- এনসিপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এহতেশামুল হক, লেবারপার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান খালেদ, এলডিপির সিলেট মহানগর সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন লিটন, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ ও সিলেট মহানগর সভাপতি এডভোকেট আব্দুর রহমান আফজল, এবি পার্টির সিলেট মহানগর আহ্বায়ক মো. ওমর ফারুক, জাগপা সিলেট মহানগর সভাপতি শাহজাহান আহমদ লিটন ও বিডিপি সিলেট মহানগর আহ্বায়ক কবির আহমদ প্রমূখ।


বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনালের ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সিলেটবাসীর সামনে এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। এই অঞ্চল থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে সিলেটবাসী জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোট প্রার্থীদের ভোট প্রদানের মাধ্যমে সেই অগ্রযাত্রায় অংশ নিতে হবে।


জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা’র সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হতে হলে নিজ দলের নেতা হলে হওয়া যায় না ১৮ কোটি মানুষের নেতা হতে হয়। ডা. শফিকুর রহমান নিজেকে ১৮ কোটি মানুষের নেতা হয়ে গেছেন।


বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী- দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জানানোর আহবান জানান। আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে ইসলাম, দেশ ও জাতিকে রক্ষায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে হবে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারী জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, আগামী ১২ তারিখ এক নতুন সূর্যোদয় হবে। যে সূর্যোদয় হবে তারুণ্যের জয়ের, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। তরুণ প্রজন্মকে সেই বিজয়মুকুট নিয়ে আসতে হবে।


সভাপতির বক্তব্যে সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, সিলেটের আলিয়া মাঠের জনস্রোত প্রমাণ করেছে সিলেটের মানুষ ইনসাফের পক্ষ সাড়া দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যা’ কে এবং প্রতীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।


No comments:

Post a Comment

Pages