সময় ডেস্ক : বিয়েতে ‘আনন্দ-ফুর্তির’ নামে অতিরিক্ত খরচ করা হয় বলে দাবি করেছেন সংসদ সদস্য লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম। বিয়েতে অতিথি ১০০ জনের বেশি হলে প্রতি জনে ১০০০ টাকা ট্যাক্স নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর দাবি, বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় কমানো গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বিয়ে শাদীতে বিত্তবৈভবের অশ্লীল প্রদর্শনীতে বিপুল অপচয় হয়। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের নৃত্যের জন্য এক মাস পর্যন্ত কোরিওগ্রাফির প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়। এসব অনুষ্ঠানে ব্যাপক অর্থ ব্যয় হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ গানসহ হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। খাবারেরও অর্ধেকের বেশি অপচয় হয়। এই অপচয় বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, আগে একটি অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন ছিল। সেখানে ১০০ জনের বেশি অতিথি হলে ট্যাক্স দিতে হতো। আমরা প্রস্তাব করছি, ১০০ জনের বেশি প্রতিটি অতিথির জন্য এক হাজার টাকা করে সরকারি ট্যাক্স নির্ধারণ করা হোক।
শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, বিয়ে শাদীতে বিত্তবৈভবের এই ধরনের অশ্লীল প্রদর্শনী ও অপচয় বন্ধ করা গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
দেশে এমন অনেক আইন ও আদেশ আছে, বাস্তবে যার প্রয়োগ নেই। ১৯৮৪ সালে জারি করা ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’ এমনই একটি। সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধ এবং অতিথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার আদেশটি আবার নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।
দেশে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধ এবং অতিথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৯৮৪ সালে ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ, ১৯৮৪’ (দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪) জারি করা হয়। দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচয় রুখতে এই আদেশটি জারি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলের ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’-এর ৩ (১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই বিশেষ এই আদেশটি জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
আদেশটি আবার নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। ২২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বিয়ে ও গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয় রোধে অতীতে ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ কার্যকর করার আহ্বান জানান।
‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’-এ আসলে কি আছে?
প্রধান ধারা ও নিয়মাবলি: ১০০ জনের বেশি অতিথি নিষিদ্ধ: এই আদেশের মূল শর্ত ছিল, কোনো ব্যক্তি বা আয়োজক বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা বা যেকোনো সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে (আয়োজক পরিবার বাদে) চাল বা গমের তৈরি কোনো খাবার পরিবেশন করতে পারবেন না।
বিশেষ অনুমতি ও রাজস্ব: বিশেষ কারণে যদি কোনো অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথিকে খাওয়াতেই হয়, তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে ‘ফরম-এ’-র মাধ্যমে পূর্ব অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুধু তা–ই নয়, ১০০ জনের অতিরিক্ত প্রতি অতিথির জন্য সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জনপ্রতি ২৫ (শুরুতে ছিল ১০) টাকা ফি জমা দিতে হবে।
তদারকি ও তল্লাশির ক্ষমতা: নিয়ম ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তদারকি করার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক, পুলিশের গেজেটেড কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসক বা ইউএনও মনোনীত যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ও তল্লাশি করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
শাস্তি: ১৯৫৬ সালের মূল আইনের আওতায় এই আদেশ অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ম ভাঙলে অনুষ্ঠানের আয়োজক এবং যে স্থানে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে (যেমন কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল) তার মালিকের জরিমানা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ডের বিধান ছিল।
সংশোধনী: ২০০৩ সালে এই আদেশে একটি সংশোধনী আনা হয়। মিলাদ মাহফিল, ইফতার পার্টি, কুলখানি, চেহলাম, ওরস বা শ্রাদ্ধের মতো বিশুদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে অতিথির বাধ্যবাধকতা বা অতিরিক্ত ফির আওতামুক্ত করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি: আদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা না হলেও যথাযথ প্রয়োগ এবং নজরদারির অভাবে বর্তমানে এটি প্রায় নিষ্ক্রিয়। রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন সেন্টারে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান হলেও অনুমতি নেওয়া বা ফি দেওয়ার নিয়মটি এখন আর চর্চা করা হয় না।

No comments:
Post a Comment