সময় ডেস্ক : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির এক নেতা, এক প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, এক পোলিং কর্মকর্তাসহ অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে, কেউ ভোট দিয়ে ফেরার পথে এবং কেউ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কোথাও মৃত্যুকে ঘিরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও উঠেছে।
খুলনায় বিএনপি নেতার মৃত্যু, জামায়াতের বিরুদ্ধে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ
খুলনায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মহানগর বিএনপি নেতা মহিবুজ্জামান কচি (৬০) মারা গেছেন। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে। মহিবুজ্জামান কচি খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন।
বিএনপির অভিযোগ, মহিবুজ্জামান কচি সকালেই খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। কেন্দ্রের ভেতরে ভোট চাওয়ার বিরোধিতা করলে প্রতিপক্ষ জামায়াতের লোকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এতে তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মহানগর বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, মহিবুজ্জামান কচি দীর্ঘদিন হৃদ্রোগে ভুগছিলেন। তিনি সকালেই খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। সকাল থেকেই কেন্দ্রে উত্তেজনা ছিল। আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবদুর রহিম জামায়াতের প্রচারণায় ছিলেন। তাঁকে বাধা দিলে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মহিবুজ্জামান কচিকে ধাক্কা দেন এবং তিনি গাছের সঙ্গে মাথায় আঘাত পান। পরে তাঁকে বেসরকারি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আবদুর রহিম মিয়ার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জামায়াতের কেন্দ্র পরিচালক মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নারী কর্মীদের বিএনপির লোকজন বের করে দিচ্ছিলেন। আমি বাধা দিই। তখন তাঁদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে শুনি, তিনি মারা গেছেন। কাউকে ধাক্কা বা মারধরের ঘটনা ঘটেনি।’
খুলনা-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘খুলনায় বিএনপিতে বিষাদের ছায়া। সকালে আলিয়া মাদ্রাসার কেন্দ্রে জামায়াত নেতার আঘাতে খুলনা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মহিবুজ্জামান কচি নিহত হয়েছেন। আমরা অবিলম্বে জামায়াত নেতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও তাঁর সহযোগীকে গ্রেপ্তারের এবং যাঁরা নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পোলিং কর্মকর্তার মৃত্যু
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের কাচারিপাড়া এলাকায় সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তন ভোটকেন্দ্রে সকাল আটটার দিকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন ২ নম্বর বুথের পোলিং কর্মকর্তা মো. মুজাহিদুল ইসলাম (৪৮)। পরে লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইসলামী ফাউন্ডেশনের শিক্ষক ছিলেন।
সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম মিলনায়তন ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শামীম আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি কর্মরত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যান। সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, লাশ হাসপাতালের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে মৃত্যু
সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ভোট দেওয়ার জন্য বের হয়ে রাস্তায় অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন এক ব্যক্তি। আজ সকালে উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের মাছিহারা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তির নাম অনাথ ঘোষ (৬৫)।
মৃত ব্যক্তির ভাতিজা জয়দেব ঘোষ বলেন, তাঁর কাকা সকালে নাশতা শেষে ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে সকাল সাড়ে আটটার দিকে বের হন। তিনি মাছিহারা প্রাইমারি স্কুলে ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পাঁচমাথা নামক স্থানে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে দ্রুত তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার পর জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রামে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু
চট্টগ্রাম-৯ আসনের বাটালি রোডের কাজীর দেউড়ি পেয়ার মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়েন মো. মনু মিয়া (৫৭)। পরে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মনু মিয়া একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভোটারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর চাচা ফজল কবির বলেন, ভোট দেওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু ভোট দেওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হলো।
ভৈরবে তাড়া খেয়ে একজনের মৃত্যুর অভিযোগ
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় রাজ্জাক মিয়া (৫৫) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ভোট দিয়ে বের হওয়ার পর কেন্দ্রসংলগ্ন স্থানে বসে ছিলেন রাজ্জাক মিয়া। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসে লোকজনকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং লাঠিপেটা করেন। তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কিশোর কুমার ধর বলেন, রাজ্জাক মিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাঁর শরীরে আঘাতের আলামত পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানিকগঞ্জে ভোট দিতে গিয়ে একজনের মৃত্যু
মানিকগঞ্জে ভোট দিতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন এক ভোটার। আজ বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই ঘটনা ঘটে। মৃত ব্যক্তির নাম বাবু মিয়া (৭০)। তিনি পেশা ভ্যান চালক ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, সকালে ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন তিনি। চারদিকে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ভিড়ের মধ্যেই শান্তভাবে ভোটার স্লিপ সংগ্রহ করে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বাবু মিয়া। কিন্তু হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আকস্মিক তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
ঘটনার সততা নিশ্চিত করে ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাইবান্ধায় ভোট দিয়ে ফেরার পথে মৃত্যু
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ওসমানেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে ফেরার পথে বাছের চৌধুরী (৬০) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। আজ বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে প্রায় ৫০০ গজ দূরে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আশরাফুল কবির বলেন, বৃদ্ধের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকায় ভোট দিতে গিয়ে একজনের মৃত্যু
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি কেন্দ্রে আজ সকালে ভোট দিতে গিয়ে আবু সাঈদ সরকার (৫৩) নামে এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। তিনি সাবেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি সপরিবারে রাজধানীর মানিকনগরে থাকতেন।
আবু সাঈদের স্ত্রী প্রীতি ইসলাম ওরফে পারভীন গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁর স্বামী আজ সকালে ঘুম থেকে জেগে ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর অগ্রদূত বিদ্যা নিকেতন স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। তাঁর কাছে খবর আসে তাঁর স্বামী স্কুল ভবনের চতুর্থ তলার সিঁড়িতে অচেতন হয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাঁকে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. ফারুক এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ময়মনসিংহে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার মৃত্যু
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ বোধ করলে তাঁকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর নাম মো. রেজাউল করিম। তিনি উপজেলার দরাবন্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি মাজরাকুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমানের পক্ষ থেকে শোক বার্তায় জানানো হয়, মৃত্যুকালে রেজাউলের বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর।

No comments:
Post a Comment