সময় ডেস্ক : সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার নামে কি হচ্ছে ; তা অনলাইন স্যোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে রীতিমত ঝড় বইয়ে দিয়েছেন।
তিনি ডা. আব্দুস ছালাম। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক উপ-পরিচালক।
ফেসবুকে পোস্ট করা তার স্ট্যাটাসটি পাঠকের জন্য হুবহু তোলে ধরা হল-
সরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে মানবিকতা হারিয়ে গেলে রাষ্ট্র কী জবাব দেবে?
সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বাস্তব ও বিবেক নাড়া দেওয়া অভিজ্ঞতা
তারিখ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬
সময়: বিকাল ২টা ১৫ মিনিট
একজন টাইলস মিস্ত্রির সহযোগী তার কাটার মেশিনে দুর্ঘটনাজনিতভাবে আহত হন।
ক্ষতটি ছিল একটি পরিষ্কার ধারালো ইনসাইসড ইনজুরি, কনুইয়ের একটু উপরে, প্রায় অর্ধেক মাংস পর্যন্ত গভীর।
রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি নিজেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিই, প্রেসার ব্যান্ডেজ করি
এবং নিশ্চিত হই যে এখানে মাত্র ৪–৫টি সেলাই দিলেই যথেষ্ট।
মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে—যদিও এই রোগীর চিকিৎসার দায় আমার ছিল না
(এটি ঠিকাদারের দায়িত্ব)—
তবুও আমি তাকে আমার ব্যক্তিগত গাড়িতে, আমার একটি ভিজিটিং কার্ডসহ ড্রাইভারের মাধ্যমে
সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে পাঠাই।
ইমার্জেন্সিতে ঢুকেই চিকিৎসা বন্ধ!
ড্রাইভার সেখানে গিয়ে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখানোর কোনো সুযোগই পায়নি।
বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও—
এমএলএসএস,
ওয়ার্ড বয়,
এমনকি একজন মহিলা ইন্টার্ন ডাক্তারও—
কেউ আমাকে ফোনে সংযুক্ত করে দিলেও কথা বলতে রাজি হননি।
এরপর আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে।
একজন ব্যক্তি (যিনি যে চিকিৎসক নন, তা স্পষ্ট) একটি সাদা কাগজে লিখে দেন—
X-ray: Elbow joint & Shoulder joint
এবং শর্ত জুড়ে দেন—
“এক্সরে না করলে কোনো চিকিৎসা হবে না।”
একজন রক্তাক্ত রোগী,
যার ক্ষত চোখে দেখা যাচ্ছে,
যার এক্সরের কোনো ক্লিনিক্যাল ইন্ডিকেশন নেই—
তাকে কেন অপ্রয়োজনীয় এক্সরে করাতে হবে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর কেউ দেয়নি।
এক্সরে না হলে চিকিৎসা নয়—এই নীতির মালিক কে?
ড্রাইভার এক্সরে করাতে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর জানানো হয়—
“আজ আর এক্সরে হবে না।”
অর্থাৎ,
হাসপাতালে এক্সরে না হলে চিকিৎসা নেই।
বাইরে এক্সরে করাতে বাধ্য হলে তবেই চিকিৎসা মিলবে।
এই বাস্তবতা কি আর নতুন কিছু?
সবাই জানে—
হাসপাতালে না হলে রোগী বাইরে যাবে,
আর মাস শেষে সেই বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে
কে বা কারা সুবিধা পাবে—
সেটাও অজানা নয়।
চরম অসম্মান ও পেশাগত অবমাননা
পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি দায়িত্বশীলভাবে
ডিডি সাহেব ও ইএমও-কে ফোন করি,
কিন্তু কোনো কার্যকর প্রতিকার পাইনি।
বরং আরও অপমানজনক তথ্য শোনা গেল—
একজন মহিলা ইন্টার্ন নাকি সবাইকে বলে দিয়েছেন,
যেন কেউ আমার ফোন না ধরে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন—
আমি এই হাসপাতালেই একসময়
সিএ, এডি (এডমিন) ও ডিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
কিন্তু আজ পরিচয় বড় কথা নয়।
প্রশ্ন হলো—
একজন রক্তাক্ত রোগীর জন্য
ন্যূনতম মানবিক সাড়া কি পাওয়ার যোগ্য ছিল না?
বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে
সব দিক বিবেচনা করে আমি নিজে সেখানে না গিয়ে
ড্রাইভারকে নির্দেশ দিই রোগীকে
পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে।
সেখানে—
কোনো নাটক হয়নি।
কোনো অপ্রয়োজনীয় এক্সরে চাওয়া হয়নি।
ইএমও দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োজনীয় সেলাই করেন।
মোট খরচ: ৩,৫০০ টাকা।
আমি তাৎক্ষণিক বিকাশে পাঠিয়ে দেই।
তাদের সেবায় আমি সন্তুষ্ট।
এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের কাছে
রক্তক্ষরণ বন্ধ করা কি এখন ঐচ্ছিক দায়িত্ব?
ইমার্জেন্সিতে এমপ্যাথি ও সিমপ্যাথি কি বিলাসিতা হয়ে গেছে?
অপ্রয়োজনীয় এক্সরে দিয়ে রোগী হয়রানি কি পেশাগত নৈতিকতার অংশ?
ইন্টার্ন, এমএলএসএস বা ওয়ার্ড বয়ের এমন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার কেউ কি নেই?
শেষ কথা
এই লেখা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়।
এটি মাননীয় পরিচালক, উপ-পরিচালক
এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য
একটি নথিভুক্ত প্রতিবাদ।
আমাদের সময়ে এমন ছিল না।
আজ “সুষম, সাম্য ও ইনসাফের বাংলাদেশ”-এর কথা বলা হয়।
কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় যদি
অবহেলা,
বাণিজ্যিক মানসিকতা,
রোগীর মর্যাদা হানি—
এভাবেই চলতে থাকে,
তবে দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন
শুধু স্লোগানেই থেকে যাবে।
এর চূড়ান্ত ফল হবে ভয়াবহ—
মানুষ চিকিৎসকদের প্রতি বিশ্বাস হারাবে,
সম্মান তলানিতে পৌঁছাবে,
আর এই ব্যবস্থার দায়
কেউই এড়াতে পারবে না।

No comments:
Post a Comment