সরজমিন সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আসন্ন দুর্গাপূজার জন্য প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন মৃৎশিল্পীরা। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ থেকে প্রতিমা তৈরিতে কারিগররা দল বেঁধে কাজ করছেন। মৃৎশিল্পীদের দক্ষ হাতের কারিগরিতে চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার কাজ। তার পর সে সব প্রতিমা পূজাঅর্চনার জন্য চলে যাবে মণ্ডপে।
প্রতিমা তৈরির স্থলে কোতোয়ালি থানার অধীনস্থ দুজন সহকারী পুলিশ উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্ব সার্বক্ষণিক ২৪জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন।
কথা হয় মৃৎশিল্পীদের প্রধান রাদেশ শান মনিরীষী দাস এর সাথে। তিনি সিলেট বাণীতে জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে চারজন কারিগর নিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। এখন চলছে শেষ ভাগের সাজসজ্জার চূড়ান্ত পূর্বের কাজ। ছোট প্রতিমা ২৫ হাজার, মধ্যম ৩৫ ও বড় সাইজের প্রতিটি প্রতিমা ৪৫/৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তবে গত বছর ৪৮টি প্রতিমা বিক্রি করলেও এবছর ৩৭টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। এখনো কয়েকটা অবিক্রীত রয়েছে বলে জানান।
সিলেট জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এবার সিলেট মহানগর ও জেলায় ৫৯৩টি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তার মধ্যে সার্বজনীন ৫৪৪টি ও পারিবারিক ৪৯টি পূজোর আয়োজন করা হয়। যা গত বছরের তুলনায় ২৪টি কম।
এবছর সিলেট মহানগরীর মধ্যে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ৪১টি, জালালাবাদ থানায় ১৬টি, এয়ারপোর্ট থানায় ৪০টি, শাহপরান (রহ:) থানায় ২২টি, দক্ষিণ সুরমা থানায় ১৬টি ও মোগলবাজার থানা এলাকায় ১৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।
সিলেট জেলার মধ্যে গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৫৯টি, বালাগঞ্জ উপজেলায় ৩০টি, কানাইঘাট উপজেলায় ২৯টি, জৈন্তাপুর উপজেলায় ২২,টি, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ৪২টি, বিশ্বনাথ উপজেলায় ২৫টি, গোয়াইনঘাট উপজেলায় ৪০টি, জকিগঞ্জ উপজেলায় ৮৪টি, বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৪৪টি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ২৯টি ও ওসমানীনগর উপজেলায় ৩৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী ০৯ অক্টোবর (বুধবার) মহাষষ্ঠীর তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। মহাসপ্তমী ১০ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার), মহাষ্টমী ১১ অক্টোবর (শুক্রবার), মহানবমী ১২ অক্টোবর (শনিবার) ও ১৩ অক্টোবর (রোববার) প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে সনাতন ধর্মালম্বীদের এই বড় ধর্মীয় উৎসব।
দুর্গা শব্দের অর্থ হলো ব্যূহ বা আবদ্ব স্থান। যা কিছু দুঃখ কষ্ট মানুষকে আবদ্ধ করে, যেমন বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ, শোক, জ্বালা, যন্ত্রনা এসব থেকে তিনি ভক্তকে রক্ষা করেন। শাস্ত্রকাররা দুর্গার নামে অন্য একটি অর্থ করেছেন । দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায় তিনিই দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাঁকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন।
হিন্দু পূরাণ মতে দুর্গাপূজার সঠিক সময় হলো বসন্তকাল কিন্তু বিপাকে পড়ে রামচন্দ্র, রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি বসন্তকাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শরতেই দেবিকে অসময়ে জাগ্রত করে পূজা করেন। সেই থেকে অকাল বোধন হওয়া সত্ত্বেও শরত কালে দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়ে যায়।
হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়, দোলায় বা পালকিতে দেবী দুর্গার গমন বা আগমন হলে, তার ফল মহামারী ও দুর্ভোগের সমান। ঘোটক বা ঘোড়ায় দেবীর গমন-আগমনে ছত্রভঙ্গ, ছন্নছাড়া, ধ্বংসাত্মক ফলাফল হয়। নৌকায় দেবীর আগমন বা গমন হলে ধরা শস্যশ্যামলা হয়, বসুন্ধরা সবুজে ভরে ওঠে, যার ফল শুভ। এছাড়াও গজে বা হস্তিতে দেবীর গমনাগমন হলেও শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা থাকে। ফলে ভালো ফস উৎপাদন হয়। যার ফল শুভ।
শাস্ত্র মতে, দেবী দুর্গার আগমন ২০২৪ সালে দোলা বা পালকিতে হচ্ছে। শাস্ত্রে আছে, ‘দোলায়াং মকরং ভবেৎ’, দোলায় আসা মকরতূল্য বা মহামারীর ইঙ্গিত। যার ফল শুভ নয়। এতে বিপুল দুর্ভোগ, দুর্যোগের সম্ভাবনা থাকে। দুর্গাপূজার জন্য সনাতন ধর্মালম্বীরা অস্থায়ী পূজামণ্ডপ তৈরিসহ, আলোকসজ্জা, গেইট নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রঞ্জন ঘোষ ও সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশ সিলেট বাণীকে জানান, শারদীয় দুর্গাপূজা সফলের লক্ষ ইতিমধ্যে প্রতি বছরের ন্যায় সিলেট জেলা প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে পূজা উদযাপন পরিষদ নেতৃবৃন্দ সভা করেছেন। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে পালনে সর্ব মহল থেকে সহযোগীতার আশ্বাস প্রদান করেছেন। তবে, আতশবাজি বা পটকা না ফোটাতে তারা নির্দেশ প্রদান করেন।
এদিকে, আসন্ন শারদীয় দূর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে সিলেট জেলা পুলিশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয় সভায় জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো দুষ্কৃতকারী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। ফেসবুকে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিলেট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, যে যার জায়গা থেকে কাজ করলে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা স্বাচ্ছন্দ্যে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারবে। সবার সহযোগিতায় সফলভাবে পূজা উদযাপনের প্রত্যাশা করেন।


No comments:
Post a Comment