মিয়ানমারে জনক্ষোভে বিস্ফোরণ - সময় আমাদের (somoy amader)

শিরোনাম


Sunday, 21 February 2021

মিয়ানমারে জনক্ষোভে বিস্ফোরণ


বহির্বিশ্ব ডেস্ক :
আন্দোলনের আগুনে পুড়ছে মিয়ানমার। এদিকে প্রমাদ গুণছে ক্ষমতা দখলকারীরা সেনারা। তাদের বিভিন্ন সময়ের হুশিয়ারি সতর্কতা সবই বানের জলের মত ভেসে যাচ্ছে। কিছুতেই রাজপথের মানুষ আন্দোলন থেকে ঘরে ফিরছে না। পুলিশের গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর মিয়ানমারের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্তসব শহরে আবারও জড়ো হয়েছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। রাজধানী ইয়াঙ্গুনের দুইটি স্থানে সমবেত হয়ে অভ্যুত্থান বিরোধী স্লোগান চালিয়ে যাওয়া ছাড়াও মান্দালয় শহরের শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছে হাজার হাজার মানুষ।


ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, মিয়ানমারে চলমান বিক্ষোভ আর নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে দেশটির সামরিক বাহিনী। মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শহরে টানা বিক্ষোভ চলছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, কবি, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামরিক শাসন অবসানের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। অভ্যুত্থানবিরোধীরা সর্বশেষ নির্বাচনে জয়ী নেত্রী অং সান সু চি’র মুক্তিরও দাবি জানাচ্ছেন। এর আগে মাথায় গুলিবিদ্ধ এক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালায়ে।


বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ছোড়া গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়।পুলিশি অভিযানের পরদিনই  গত রোববার সকালে মান্দালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছে লাখ লাখ মানুষ। উত্তরের শহর মাইতিককাইনাতে মানুষ নিহত বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। গত কয়েক দিনে এই শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হলেও রবিবার তরুণেরা অভ্যুত্থানবিরোধী ব্যানার নিয়ে মোটরবাইক মিছিল করেছে। 


এছাড়াও মধ্যাঞ্চলীয় শহর মনিওয়া ও বাগান এবং দক্ষিণের শহর দাওয়েই ও মাইয়েক শহরেও বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে।মান্দালয়ের এক তরুণ বিক্ষোভকারী বলেন, ‘তারা নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তারা আমাদের ভবিষ্যতকে লক্ষ্যবস্তুবানিয়েছে।’ সেনা সরকারের বলপ্রয়োগ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জাও মিন তুন। তবে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সংবিধান অনুসরণ করেই কাজ করছে আর বেশিরভাগ মানুষ সমর্থন করছে।  সহিংসতার জন্য তিনি বিক্ষোভকারীদের দায়ী করেন। 


শীর্ষ অভিনেতা গ্রেফতার :

মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে সামরিক অভ্যুত্থান বিরোধী প্রতিবাদে দুই জন নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর দেশটির খ্যাতিমান একজন অভিনেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ১ ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থান বিরোধী প্রতিবাদ সমর্থন করার কারণে এই অভিনেতাকে খোঁজা হচ্ছিল,  গত রোববার জানিয়েছেন তার স্ত্রী।সামরিক শাসনের অবসান এবং কারাবন্দি নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চি ও অন্যান্যদের মুক্তির দাবিতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের শহর ও নগরগুলোতে চলা বিক্ষোভে গত শনিবার ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন, এ দিন মান্দালয়ে 


বিক্ষোভকারীদের দিকে গুলি ছুড়ে পুলিশ ও সৈন্যরা; এ সময় দুই জন নিহত হন ও বহু লোক আহত হয়। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেনাবাহিনী নতুন নির্বাচন করে বিজয়ীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা তা বিশ্বাস করতে পারছে না।সরকারি কর্মচারীদের ‘আইন অমান্য’ আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করার জন্য যে ছয় খ্যাতিমান ব্যক্তির বিরুদ্ধে উস্কানি-বিরোধী আইনে সেনাবাহিনী  গত বুধবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল অভিনেতা লু মিন তাদের একজন।


মিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে তার দুই বছর কারাদন্ড হতে পারে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইয়াঙ্গনে লু মিন বেশ কয়েকটি প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। তার স্ত্রী খিন সাবাই উ নিজের ফেইসবুক পেইজে পোস্ট করা এক ভিডিওতে বলেছেন, ইয়াঙ্গনের তাদের বাড়িতে পুলিশ এসে তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। ‘তারা শক্তি প্রয়োগ করে দরজা খুলে তাকে ধরে নিয়ে যায়, তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা আমাকে জানায়নি। আমি তাদের থামাতে পারিনি। তারা আমাকে জানায়নি,’ বলেছেন তিনি।রয়টার্স জানিয়েছে, মন্তব্যের জন্য তারা বারবার সামরিক মুখপাত্র জ মিন তুনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।


কী বলছে সামরিক প্রশাসন :  

গত মঙ্গলবার মিয়ানমারের নতুন সামরিক কাউন্সিলের মুখপাত্র তুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,সংবিধান মেনেই সেনাবাহিনী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং জনগণের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাতে সমর্থন দিচ্ছে। সহিংসতা উস্কে দেওয়ার জন্য প্রতিবাদকারীদের দায় দিয়েছেন তিনি।


বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ :

তুনের দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের আন্দোলনকারীরা। এটাকে তারা সরাসরি মিথ্যাচার বলে উল্লেখ করেছে। সামরিক শাসনের প্রতি মিয়ানমারবাসীর কোন সমর্থন নেই। তারা এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে রাজপথে মিছিল সমাবেশ অব্যাহত রেখেছে। তাই সামরিক জান্তার দাবি একেবারেই হাস্যকর বলে জানায় ‘অ্যাসিসট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার’ নামে একটি গোষ্ঠি।  গত শনিবার তারা দাবি করেছে চলমান আন্দোলনে ঠেকাতে অবৈধ সেনা শাসকেরা  এ পর্যন্ত ৫৬৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদেরকে অজ্ঞাতস্থানে রাখা হয়েছে। এমনকি তাদের কোন খোঁজ খবরও পরিবারকে জানানো হচ্ছে না। আমরা ধারনা করছি এদেরকে গোপনস্থানে আটকে রেখে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে এই জান্তা সরকার। আরেকটি ঘটনায় শনিবার রাতে ইয়াঙ্গনে একজন নৈশপ্রহরী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। রেডিও ফ্রি এশিয়ার বার্মিজ সার্ভিস বলেছে, পুলিশ তাকে গুলি করেছে কিন্তু কেন গুলি করেছে তা পরিষ্কার নয়।নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালাতে পারে আশঙ্কায় নগরীর বিভিন্ন মহল্লার বাসিন্দারা অতিরিক্ত নৈশপ্রহরী নিয়োগ করছেন বলে জানা গেছে। 


গত ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর পরই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মিয়ানমারের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ২ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির রাজধানী নেপিদো, প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনসহ বিভিন্ন শহরে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ চলছে।মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সহিংস আচরণ করতে শুরু করেছে। সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে দেশটিতে এখন পর্যন্ত এক তরুণীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন।  গত শনিবার ম্যান্ডেলাই শহরে পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত হয়।


সেনাবাহিনীর পেজ বন্ধ করল ফেসবুক : 

সহিংসতা উসকে দেয়ার অভিযোগে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর একটি ফেসবুক পেজ বন্ধ করে দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। গালফ নিউজের খবরে বলা হয়,  গতকাল কর্তৃপক্ষ ‘ট্রু নিউজ’ নামে ওই পেজটি বন্ধ করে দেয়।মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পেজ বন্ধের বিষয়ে গালফ নিউজের খবরে বলা হয়, ওই ফেসবুক পেজে গত নভেম্বরে সুচি ভোট জালিয়াতি করে জয় পেয়েছে দাবি করা হয়। 


এছাড়া পেজটিতে বিক্ষোভকারীদের ভয় দেখানো হয়।ফেসবুকের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘ট্রু নিউজ ইনফরমেশনটি টিম’ পেজটি কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন করার জন্য ডাউন করা হয়েছে। পেজটির মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেয়া হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট সাম্প্রতিক বছরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত শত শত পেজ নিষিদ্ধ করে। ওইসব পেজে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে বিদ্বেষমূলক পোস্ট করা হচ্ছিল। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রেহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী প্রায় ১০ রাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।জাতিসংঘ রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করে। সংস্থাটির তদন্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা সংগঠিত করেছে উঠে আসে এবং তাদের বিচারের মুখোমুখী করার সুপারিশ করা হয়।


এরপর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মিয়ামনারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং এবং শীর্ষ কিছু সেনা কর্মকর্তাকে ফেসবুক প্লাটফর্ম থেকে বিতাড়িত করে। এছাড়া ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহরত সশস্ত্রগোষ্ঠী এবং কট্টরপন্থি বৌদ্ধ যারা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা উসকে দিচ্ছিল তাদেরও নিষিদ্ধ করে।


সুচির বিরুদ্ধে মামলা :

সু চিকে তার রাজনৈতি দল ন্যাশনাল লীগ ফল ডেমোক্রেসির (এনএলডি) অন্তত ২৪ জন নেতার সঙ্গে কাস্টডিতে নেয়া হয়েছে। সেনা সরকার সুচির বিরুদ্ধে অবৈধ ওয়াকিটকি রাখা ও পরিবেশ বিপর্যয় আইনে দুটি চার্জশীট গঠন করেছে। গত নভেম্বরে ভোট কারচুপির অভিযোগে অভ্যুত্থান করা হয়েছে বলে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ বৈধ করার চেষ্টা করছে।


সতর্ক করলো জাতিসংঘ : 

সেনা অভুত্থান বিরোধী বিক্ষোভে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে মিয়ানমারকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির প্রধান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক টুইট বার্তায় লিখেছেন এই ধরনের বলপ্রয়োগের ঘটনা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শহরে টানা বিক্ষোভ চলছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, কবি, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামরিক শাসন অবসানের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। 


অভ্যুত্থানবিরোধীরা সর্বশেষ নির্বাচনে জয়ী নেত্রী অং সান সু চি’র মুক্তিরও দাবি জানাচ্ছেন। এর আগে মাথায় গুলিবিদ্ধ এক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে গত শনিবার দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালায়ে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ছোড়া গুলিতে দুই বিক্ষোভকারী নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়। ওই ঘটনার পর এক টুইট বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব লিখেছেন, ‘মিয়ানমারে প্রাণঘাতী সহিংসতার নিন্দা জানাচ্ছি। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ, ভয় দেখানো এবং হয়রানি করা অগ্রহণযোগ্য।’শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সকলের রয়েছে জানিয়ে ওই টুইট বার্তায় জাতিসংঘ মহাসচিব সব পক্ষকে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে এবং বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।’


No comments:

Post a Comment

Pages